তখন মধ্যরাত, কাজ
শেষ করে ব্যাগপত্র নিয়ে ল্যাব থেকে বেরুচ্ছিলেন প্রফেসর ডক্টর অরুণ। বিগত নয়টা মাস প্রচুর
খাটুনি গেছে তার উপর দিয়ে। শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটা কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন স্বয়ংক্রিয়
মাল্টিপারপাস বায়োমেডিকেল ডিভাইস এর কাজ করছিলেন এক রকম নিজেরই অর্থায়নে। দুবছর আগে
বড় বড় বায়োমেডিকেল কোম্পানির কাছে এই প্রজেক্টে ফান্ডিং চেয়েও পাননি ডক্টর অরুণ। সবারই
এক কথা, এই ডিভাইস আবিষ্কার করলে আমাদের হাজার হাজার স্পেশালাইজড ডিভাইস অচল হয়ে পড়বে,
আর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির সম্মুখীন হবে কমবেশি সকল কোম্পানি। তাই এক রকম বাধ্য
হয়ে নিজের অর্থায়নে নিজেরই ল্যাবে কাজ শুরু করে দেন প্রফেসর। ল্যাবের নিচে পার্কিং
এ রাখা গাড়িতে উঠার সময় হঠাৎ পেছন থেকে …ধুম…ম…ম। মাথায় প্রচন্ড আঘাত পেয়ে নিজেকে সামলে
নিতে না নিতেই প্রফেসরের মুখে চেতনানাশক স্প্রে করে গাড়িতে তুলে নিলো কয়েকজন দুষ্কৃতিকারী।
সাঁই সাঁই করে গাড়ি
ছুটছে নেলসন স্ট্রীট এর প্রশস্ত হাইওয়ে ধরে, ঘন্টা খানেক পরেই একটা পুরোনো ইয়ার্ডের
কাছে এসে থামলো গাড়ি। জ্ঞান ফিরতেই প্রফেসর নিজেকে আবিষ্কার করলেন ইয়ার্ডের এক কোণে
পুরোনো লোহা লক্করে জঞ্জালের ভেতর, হাত-পা-মুখ বাধা অবস্থায়। মাথার পেছন দিকটা ফুলে ঢোল হয়ে গেছে, একটু নড়াচড়া করে উঠে বসতেই হোমরা-চোমরা মুখোশধারী লোকগুলো ছুটে এলো প্রফেসরের দিকে।
বলা নেই কওয়া নেই, এসেই খুব মারধর শুরু করেছে প্রফেসরকে, স্বয়ংক্রিয় ডিভাইস এর হদিস জানতে চায় তারা।
-Hey Professor,
Where is the Artificial Medical device?
-হা হা হা, এই ডিভাইস
এমন ম্যাটেরিয়ালে তৈরী যা খালি চোখে দেখা যায় না।
-You are crossing
your limit, how we can find that device?
-আমি জানিনা, নিজেরা পারলে খুঁজে বার করো গিয়ে।
- So, go to the Hell.
ঘন্টাখানেক বেদম প্রহারের শিকার হয়ে প্রফেসরের প্রাণ যায় যায় অবস্থা, একরকম আধমরা অবস্থায় লোকগুলো তাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে ফেলে দেয় রকি আইল্যান্ডের কাছের সমুদ্র সৈকতে। পুরো শরীর অসাড় হয়ে এসেছে প্রফেসরের, মাথাটা ভনভন করছে যেন বিশাল পাহাড় মাথায় চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। সৈকতের বালি নাকেমুখে লেপ্টে আছে, খুব ধীরে ধীরে শ্বাস নিচ্ছিলেন প্রফেসর। মনে পড়ে গেল ৮ হাজার কিলোমিটার দূরের সেই সৈকতের ফেলে আসা ছেলেবেলা, বালি আর নোনা জলে হেসে-খেলে গড়ে উঠেছিল যে শৈশব। আরো মনে পড়ে বাবা-মায়ের মুখ, প্রিয় বন্ধুরা আর সাথে ঈষৎ ভেসে উঠল অরুণিমার চেহারার প্রতিচ্ছবি। প্রায় দেড়যুগ আগের স্মৃতিগুলো পরিষ্কার ভেসে উঠছিল প্রফেসরের মনোজগতে।
উচ্চ মাধমিকের পর
ভবঘুরে জীবন, পরিবারের আশা পূরণ করতে গিয়ে নৌ-প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন বুনতে থাকা এক
যুবক। একে একে সব কটি ধাপ পেরিয়েও সিস্টেমের বাঁধায় পড়ে আর নৌ-প্রকৌশলী হবার শেষ ধাপটা
পেরোতে পারেনি সেদিনের উনিশ-কুড়ি বছরের সেই যুবকটি। ভবঘুরে জীবনের সেই দিনগুলির কথা কাউকে বলা
হয়ে উঠেনি তার, হতাশাগ্রস্থ যুবক একাই বাবা-মা কে ভরশা দিয়ে নতুন কোন স্বপ্নপূরনের
আশায় আবার বুক বাঁধে… এই স্বপ্ন তার ছোটবেলা থেকে দেখে আসা স্বপ্ন।
ম্যাকগাইভার নামের
এক টিভি সিরিজ দেখে ছোটবেলায় যে স্বপ্ন দেখেছিল- বড় হয়ে ম্যাকগাইভার হবে। আর এবার
তার নিজের দেখা সেই স্বপ্নে জল দেয়ার উপযুক্ত সময়। সাতপাঁচ ভেবে পরিবারের সম্মতি নিয়ে
ইঞ্জিনিয়ারিং-এ এডমিশন নিয়ে নেয় সেদিনের সেই হতাশাগ্রস্থ যুবক।
এরপর একে একে নিজের দক্ষতা অর্জনে মনোনিবেশ করে, বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষে এসেই তার ম্যাকগাইভারি কাজকর্মের জন্য বেশ সুখ্যাতি অর্জন করতে থাকে। তখন সবেমাত্র অরুণ ক্যম্পাসে তার কাজের জন্য বেশ সুখ্যাতি অর্জন করেছে, তারই ক্যাম্পাসের এক জুনিয়র মেয়ের সরলতায় মুগ্ধ হয়ে মনে ধরে যায় তাকে। কিন্তু কিছুতেই সেকথা কাউকে জানাতে পারেনি, কেননা আগে নিজেকে যে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।
পরের বছরগুলিতে অরুণের
ঝুলিতে উঠেছে কাজের স্বীকৃতিস্বরুপ বেশ কিছু পদক আর সম্মাননা। স্নাতকের ফাইনাল পরীক্ষা
দিয়েই একখানা রিসার্স ফার্ম থেকে কাজের সুযোগ পেয়ে লুফে নিয়েছিল অরুণ, সেই থেকে তার
ক্যারিয়ারের পথচলা শুরু। বছর দেড়েকের মতো অই প্রতিষ্টানে গবেষনা করে মোটামুটি কয়েকটি
প্রজেক্ট সম্পন্নও করেছিল অরুণ, ইতোমধ্যেই ক্যাম্পাসের সেই জুনিয়র অরুণিমাকে সাহস করে বিয়ের প্রপোজালও
দিয়ে বসে। কিন্তু সবকিছু কেমন অগোছালোভাবে এগোতে থাকে, হ্যাঁ-না নির্দিষ্ট কোন উত্তর
আসেনা অরুণিমার কাছ থেকে। আবারো কাজে মনোনিবেশ করতে গিয়েও কোথায় যেন খেই হারিয়ে ফেলে
অরুণ, এরপর আসে আরেক ধাক্কা। টানা ছয় মাস ধরে কোম্পানির প্রফিট না আসায় কর্মী ছাটাই
এর বলি হতে হয় অরুণসহ আরো বেশ কজনকে। সেই দিনটির কথা অরুণের স্পষ্টই মনে পড়ে, নৌ-প্রকৌশলী হবার স্বপ্নভঙ্গের দিনগুলো আবার তাকে উঁকি দিয়ে ডাকে।আগের মতোই আবার হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়ে অরুণ। হঠাৎ চাকুরি হারিয়ে দিশেহারা
হয়ে পড়ে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম বড় ছেলেটি। চাকুরি ছেড়ে দিয়ে সেদিন অফিসের সামনের চায়ের দোকানে কি পাগলামিটাই না করেছিল অরুণ....
-এই মামা সিগারেট
দেন।
-আফনারে তো সিগারেট
খাইতে দেহি নাই কখনো।
-খাইনাই আজকে খাব,
খাই মরলে মরব। আপনার সমস্যা?
-না মামা, তয় কোনডি
দিতাম?
-যেইটি মন চায় ওইটা
দেন।
-এই লন মামা বেনসন
খান, ঠান্ডা আছে।
প্রায় বছর ছয়েক পরে
এসে বিড়ি ধরাতে গিয়ে হাত কেঁপে কেঁপে উঠেছিল সেদিন অরুণের। এরপর হাত থেকে সিগারেট ফেলে
দিয়ে…
-এই মামা চা দেন।
-এইতো মামা লাইনে
আইছেন।
-৮-১০ কাপ দেন চা। আজকে চা খাইতে খাইতে নিজেকে শেষ করে দিব...শালার মাথাব্যাথা।
টানা ৬ কাপ চা খেয়ে জিহ্বা-গলা সব পুড়িয়ে ফেলেছে। তারপরের সময়টা শুধুই সংগ্রামের, বহু ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে পিএইচডি প্রোগ্রামের শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে আট হাজার কিলোমিটার দূরে এই বিদেশ-বিভূঁই এ আসা অরুণের, এরপর শুধুই এগিয়ে যাওয়া।
এসব কিছু ভাবতে ভাবতে চোখের সামনে সবকিছু আঁধার হয়ে আসছিল প্রফেসরের, জ্ঞান হারানোর আগেই ল্যাবের বিশ্বস্ত পিএইচডি স্টুডেন্ট আবরারকে স্মার্ট ওয়াচ থেকে স্বয়ংক্রিয় বায়োমেডিকেল ডিভাইসের সকল তথ্য পাঠিয়ে দিলেন। ধীরে ধীরে নেমে এলো অন্ধকার, ঘোর কালো অন্ধকার।
আবরারের উপস্থিত বুদ্ধিতে সেদিন প্রফেসর অরুণকে উদ্ধার করা হয় পরে, কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত জখম আর আঘাতের কারণে কোমায় চলে যান প্রফেসর। পত্রপত্রিকা আর টিভি চ্যানেলের বদৌলতে অরুণোদয়ের বিজয় সুভাষ ছড়িয়ে পড়তে থাকে এদিক-ওদিক। কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন স্বয়ংক্রিয় বায়োমেডিকেল ডিভাইস আবিষ্কারের খবরে হইচই পড়ে যায় গবেষক পাড়ায়, আবরার সামনে থেকে এগিয়ে নিয়ে যায় প্রফেসরের অসমাপ্ত কাজগুলো। পরের বছর নোবেল কমিটি প্রফেসর ডক্টর অরুণ আর তার ফেলো আবরারকে নোবেলের জন্যে মনোনীত করে।
দশ হাজার কিলোমিটার দূরের একটি ছোট্ট দেশের কোন এক কোনে টিভির নিউজে ফলাও করা হয়-
“বাংলাদেশি বিজ্ঞানীর
নোবেল জয়”
ছেলের চেঁচামেচি-তে টিভির নিউজের দিকে চোখ পড়ে অরুণিমার। এ যে তার ক্যাম্পাসের সেই অরুণ, নিউজে আবরার এর সাথে তার প্রফেসর অরুণের কোমায় থাকা চেহারা ভেসে উঠে। বুকের বাঁ-পাশটায় কেমন চিনচিনে ব্যাথা অনুভব করে অরুণিমা, আর দুচোখ বেয়ে নামে শ্রাবণের অশ্রুধারা। বিড়বিড় করে বলতে থাকে অরুণের দেয়া কবিতার বই থেকে প্রিয় দুটি লাইন-
চলে যাওয়া মানে নয় বন্ধন ছিন্ন-করা আর্দ্র রজনী
চলে গেলে আমারও অধিক কিছু থেকে যাবে
আমার না-থাকা জুড়ে।




