শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২০

অরুণোদয়


তখন মধ্যরাত, কাজ শেষ করে ব্যাগপত্র নিয়ে ল্যাব থেকে বেরুচ্ছিলেন প্রফেসর ডক্টর অরুণ। বিগত নয়টা মাস প্রচুর খাটুনি গেছে তার উপর দিয়ে। শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটা কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন স্বয়ংক্রিয় মাল্টিপারপাস বায়োমেডিকেল ডিভাইস এর কাজ করছিলেন এক রকম নিজেরই অর্থায়নে। দুবছর আগে বড় বড় বায়োমেডিকেল কোম্পানির কাছে এই প্রজেক্টে ফান্ডিং চেয়েও পাননি ডক্টর অরুণ। সবারই এক কথা, এই ডিভাইস আবিষ্কার করলে আমাদের হাজার হাজার স্পেশালাইজড ডিভাইস অচল হয়ে পড়বে, আর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির সম্মুখীন হবে কমবেশি সকল কোম্পানি। তাই এক রকম বাধ্য হয়ে নিজের অর্থায়নে নিজেরই ল্যাবে কাজ শুরু করে দেন প্রফেসর। ল্যাবের নিচে পার্কিং এ রাখা গাড়িতে উঠার সময় হঠাৎ পেছন থেকে …ধুম…ম…ম। মাথায় প্রচন্ড আঘাত পেয়ে নিজেকে সামলে নিতে না নিতেই প্রফেসরের মুখে চেতনানাশক স্প্রে করে গাড়িতে তুলে নিলো কয়েকজন দুষ্কৃতিকারী।

সাঁই সাঁই করে গাড়ি ছুটছে নেলসন স্ট্রীট এর প্রশস্ত হাইওয়ে ধরে, ঘন্টা খানেক পরেই একটা পুরোনো ইয়ার্ডের কাছে এসে থামলো গাড়ি। জ্ঞান ফিরতেই প্রফেসর নিজেকে আবিষ্কার করলেন ইয়ার্ডের এক কোণে পুরোনো লোহা লক্করে জঞ্জালের ভেতর, হাত-পা-মুখ বাধা অবস্থায়। মাথার পেছন দিকটা ফুলে ঢোল হয়ে গেছে, একটু নড়াচড়া করে উঠে বসতেই হোমরা-চোমরা মুখোশধারী লোকগুলো ছুটে এলো প্রফেসরের দিকে।

বলা নেই কওয়া নেই, এসেই খুব মারধর শুরু করেছে প্রফেসরকে, স্বয়ংক্রিয় ডিভাইস এর হদিস জানতে চায় তারা।

-Hey Professor, Where is the Artificial Medical device?

-হা হা হা, এই ডিভাইস এমন ম্যাটেরিয়ালে তৈরী যা খালি চোখে দেখা যায় না।

-You are crossing your limit, how we can find that device?

-আমি জানিনা, নিজেরা পারলে খুঁজে বার করো গিয়ে। 

- So, go to the Hell.

ঘন্টাখানেক বেদম প্রহারের শিকার হয়ে প্রফেসরের প্রাণ যায় যায় অবস্থা, একরকম আধমরা অবস্থায় লোকগুলো তাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে ফেলে দেয় রকি আইল্যান্ডের কাছের সমুদ্র সৈকতে। পুরো শরীর অসাড় হয়ে এসেছে প্রফেসরের, মাথাটা ভনভন করছে যেন বিশাল পাহাড় মাথায় চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। সৈকতের বালি নাকেমুখে লেপ্টে আছে, খুব ধীরে ধীরে শ্বাস নিচ্ছিলেন প্রফেসর। মনে পড়ে গেল ৮ হাজার কিলোমিটার দূরের সেই সৈকতের ফেলে আসা ছেলেবেলা, বালি আর নোনা জলে হেসে-খেলে গড়ে উঠেছিল যে শৈশব। আরো মনে পড়ে বাবা-মায়ের মুখ, প্রিয় বন্ধুরা আর সাথে ঈষৎ ভেসে উঠল অরুণিমার চেহারার প্রতিচ্ছবি। প্রায় দেড়যুগ আগের স্মৃতিগুলো পরিষ্কার ভেসে উঠছিল প্রফেসরের মনোজগতে।

উচ্চ মাধমিকের পর ভবঘুরে জীবন, পরিবারের আশা পূরণ করতে গিয়ে নৌ-প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন বুনতে থাকা এক যুবক। একে একে সব কটি ধাপ পেরিয়েও সিস্টেমের বাঁধায় পড়ে আর নৌ-প্রকৌশলী হবার শেষ ধাপটা পেরোতে পারেনি সেদিনের উনিশ-কুড়ি বছরের সেই যুবকটি। ভবঘুরে জীবনের সেই দিনগুলির কথা কাউকে বলা হয়ে উঠেনি তার, হতাশাগ্রস্থ যুবক একাই বাবা-মা কে ভরশা দিয়ে নতুন কোন স্বপ্নপূরনের আশায় আবার বুক বাঁধে… এই স্বপ্ন তার ছোটবেলা থেকে দেখে আসা স্বপ্ন।

ম্যাকগাইভার নামের এক টিভি সিরিজ দেখে ছোটবেলায় যে স্বপ্ন দেখেছিল- বড় হয়ে ম্যাকগাইভার হবে। আর এবার তার নিজের দেখা সেই স্বপ্নে জল দেয়ার উপযুক্ত সময়। সাতপাঁচ ভেবে পরিবারের সম্মতি নিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং-এ এডমিশন নিয়ে নেয় সেদিনের সেই হতাশাগ্রস্থ যুবক।

এরপর একে একে নিজের দক্ষতা অর্জনে মনোনিবেশ করে, বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষে এসেই তার ম্যাকগাইভারি কাজকর্মের জন্য বেশ সুখ্যাতি অর্জন করতে থাকে। তখন সবেমাত্র অরুণ ক্যম্পাসে তার কাজের জন্য বেশ সুখ্যাতি অর্জন করেছে, তারই ক্যাম্পাসের এক জুনিয়র মেয়ের সরলতায় মুগ্ধ হয়ে মনে ধরে যায় তাকে। কিন্তু কিছুতেই সেকথা কাউকে জানাতে পারেনি, কেননা আগে নিজেকে যে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।

পরের বছরগুলিতে অরুণের ঝুলিতে উঠেছে কাজের স্বীকৃতিস্বরুপ বেশ কিছু পদক আর সম্মাননা। স্নাতকের ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েই একখানা রিসার্স ফার্ম থেকে কাজের সুযোগ পেয়ে লুফে নিয়েছিল অরুণ, সেই থেকে তার ক্যারিয়ারের পথচলা শুরু। বছর দেড়েকের মতো অই প্রতিষ্টানে গবেষনা করে মোটামুটি কয়েকটি প্রজেক্ট সম্পন্নও করেছিল অরুণ, ইতোমধ্যেই ক্যাম্পাসের সেই জুনিয়র অরুণিমাকে সাহস করে বিয়ের প্রপোজালও দিয়ে বসে। কিন্তু সবকিছু কেমন অগোছালোভাবে এগোতে থাকে, হ্যাঁ-না নির্দিষ্ট কোন উত্তর আসেনা অরুণিমার কাছ থেকে। আবারো কাজে মনোনিবেশ করতে গিয়েও কোথায় যেন খেই হারিয়ে ফেলে অরুণ, এরপর আসে আরেক ধাক্কা। টানা ছয় মাস ধরে কোম্পানির প্রফিট না আসায় কর্মী ছাটাই এর বলি হতে হয় অরুণসহ আরো বেশ কজনকে। সেই দিনটির কথা অরুণের স্পষ্টই মনে পড়ে, নৌ-প্রকৌশলী হবার স্বপ্নভঙ্গের দিনগুলো আবার তাকে উঁকি দিয়ে ডাকে।আগের মতোই আবার হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়ে অরুণ। হঠাৎ চাকুরি হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম বড় ছেলেটি। চাকুরি ছেড়ে দিয়ে সেদিন অফিসের সামনের চায়ের দোকানে কি পাগলামিটাই না করেছিল অরুণ....

-এই মামা সিগারেট দেন।

-আফনারে তো সিগারেট খাইতে দেহি নাই কখনো।

-খাইনাই আজকে খাব, খাই মরলে মরব। আপনার সমস্যা?

-না মামা, তয় কোনডি দিতাম?

-যেইটি মন চায় ওইটা দেন।

-এই লন মামা বেনসন খান, ঠান্ডা আছে।

প্রায় বছর ছয়েক পরে এসে বিড়ি ধরাতে গিয়ে হাত কেঁপে কেঁপে উঠেছিল সেদিন অরুণের। এরপর হাত থেকে সিগারেট ফেলে দিয়ে…

-এই মামা চা দেন।

-এইতো মামা লাইনে আইছেন।

-৮-১০ কাপ দেন চা। আজকে চা খাইতে খাইতে নিজেকে শেষ করে দিব...শালার মাথাব্যাথা। 

টানা ৬ কাপ চা খেয়ে জিহ্বা-গলা সব পুড়িয়ে ফেলেছে। তারপরের সময়টা শুধুই সংগ্রামের, বহু ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে পিএইচডি প্রোগ্রামের শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে আট হাজার কিলোমিটার দূরে এই বিদেশ-বিভূঁই এ আসা অরুণের, এরপর শুধুই এগিয়ে যাওয়া। 

এসব কিছু ভাবতে ভাবতে চোখের সামনে সবকিছু আঁধার হয়ে আসছিল প্রফেসরের, জ্ঞান হারানোর আগেই ল্যাবের বিশ্বস্ত পিএইচডি স্টুডেন্ট আবরারকে স্মার্ট ওয়াচ থেকে স্বয়ংক্রিয় বায়োমেডিকেল ডিভাইসের সকল তথ্য পাঠিয়ে দিলেন। ধীরে ধীরে নেমে এলো অন্ধকার, ঘোর কালো অন্ধকার।

আবরারের উপস্থিত বুদ্ধিতে সেদিন প্রফেসর অরুণকে উদ্ধার করা হয় পরে, কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত জখম আর আঘাতের কারণে কোমায় চলে যান প্রফেসর। পত্রপত্রিকা আর টিভি চ্যানেলের বদৌলতে অরুণোদয়ের বিজয় সুভাষ ছড়িয়ে পড়তে থাকে এদিক-ওদিক। কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন স্বয়ংক্রিয় বায়োমেডিকেল ডিভাইস আবিষ্কারের খবরে হইচই পড়ে যায় গবেষক পাড়ায়, আবরার সামনে থেকে এগিয়ে নিয়ে যায় প্রফেসরের অসমাপ্ত কাজগুলো। পরের বছর নোবেল কমিটি প্রফেসর ডক্টর অরুণ আর তার ফেলো আবরারকে নোবেলের জন্যে মনোনীত করে।

দশ হাজার কিলোমিটার দূরের একটি ছোট্ট দেশের কোন এক কোনে টিভির নিউজে ফলাও করা হয়-

 “বাংলাদেশি বিজ্ঞানীর নোবেল জয়”

ছেলের চেঁচামেচি-তে টিভির নিউজের দিকে চোখ পড়ে অরুণিমার। এ যে তার ক্যাম্পাসের সেই অরুণ, নিউজে আবরার এর সাথে তার প্রফেসর অরুণের কোমায় থাকা চেহারা ভেসে উঠে। বুকের বাঁ-পাশটায় কেমন চিনচিনে ব্যাথা অনুভব করে অরুণিমা, আর দুচোখ বেয়ে নামে শ্রাবণের অশ্রুধারা। বিড়বিড় করে বলতে থাকে অরুণের দেয়া কবিতার বই থেকে প্রিয় দুটি লাইন-

চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়- বিচ্ছেদ নয়,
চলে যাওয়া মানে নয় বন্ধন ছিন্ন-করা আর্দ্র রজনী
চলে গেলে আমারও অধিক কিছু থেকে যাবে
আমার না-থাকা জুড়ে।

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২০

একটি মানিব্যাগের আত্মকাহিনী

 

কামরাঙ্গীরচরের এক ঘিঞ্চিগলির শেষপ্রান্তে দশ-বারো বর্গফুটের ঘর, প্রেসার ডাইস মেশিনের ঘটাঘট শব্দে পুরো ঘর মুখোরিত। একপাশে লম্বা টেবিলে বসে সমানে হাত চালিয়ে যাচ্ছে জনা দশেক শিশু শ্রমিক। ট্যানারির ছিঁড়া ফাটা লেদারের এক বস্তা এনে ধপ করে মাটিতে ফেলল নজরুল।   

-জমির বাই, আজকে টেহা বেশি দেওন লাগবো। চার-পাঁচখান ট্যানারি ঘুইরা ঘুইরা ঝুট লেদার টোকাইছি, এই এক বস্তা লেদার নিয়া ফিরতেই মেলা ধহল গেছে।

-আচ্ছা, এই দুইশত রাখ। বাকি টেহা কাইলকা লইছ।

নজরুল যেতেই জমির এক ঝটকায় বস্তা ছিড়ে ফেলল, ঠিক তখনই আমার জন্মস্থানে আত্মপ্রকাশ। বেছে বেছে দুহাতে বেশ কিছু লেদারের সাথে আমার এই বহিরাবরণকেও সাথে নিল জমির। এরপর চলল মিনিট বিশেকের পলিশ, পলিশে পলিশে আমার বাদামী বর্ণের ত্বকটা খুব চকচকে হয়ে উঠেছে। ডাইস প্রেসার মেশিনের নিচ দিয়ে যখন যাচ্ছিলাম তখন আমার মৃদু হাসি পাচ্ছিল কেননা এর আগেও বার কয়েক প্রেসার মেশিনের নিচ দিয়ে যেতে হয়েছে আমায়। ডাইস এর শেপ অনুযায়ী চিঠির খামের মতো আকৃতি পেলাম আমি, এরপর কি হয় কেজানে।

শ্রমিকদের হাতে সেলাই পড়ল আমার গায়ে, এরপর গায়ের উপর গরম ডাইসের কোন এক কোম্পানির ছাপ পড়ল। হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে লাগানো হলো টিপ বোতাম। পেস্টিং সলিউশন মেরে আমার ভেতরটা আঠা আঠা করে দিয়েছে এরা। যাই হোক, দুটো দিন এই কারখানায় থেকে ঝুট লেদার থেকে চকচকে মানিব্যাগে পরিণত হলাম। এবার সংগী সাথীদের সাথে যাত্রার পালা।

নিউমার্কেট এর ব্যাস্ত ফুটপাত, আমি ও আমার সংগী-সাথীদের ডালায় সাজিয়ে বসে আছে এক দোকানী। কারখানা থেকে ওই আমাদের পাইকারী দামে কিনে এনেছে। দিনের তপ্ত গরম কি রাতের আলোর রোশনাই, এই ডালায় পড়ে থেকে থেকে পুরোই অসাড় হয়ে গেলুম। মাঝে সাঝে পুলিশের দৌড়ানি খেয়ে ডালাসহ আমাদের ছন্নছাড়া অবস্থা হয়। আমার সামনের ছোট পকেটে থাকা ক্যালেন্ডারে আমি দিনক্ষণ হিসেব করছি…কবে আমায় কেউ আপন করে কাছে টেনে নেবে!

ঠিক পাঁচদিনের মাথায়, উষ্কখুস্ক চুলের এক কলেজ পড়ুয়া যুবক দোকানীর ডালার সামনে এসে দাঁড়ালো। বেশ ক্ষানিক্ষণ ধরে সে আমার দিকে চেয়ে আছে, সে কি আমায় পছন্দ করেছে তবে? ছেলেটির ভাবভঙ্গি আঁচ করতে পেরেই দোকানী…

-“ফ্রেশ লেদার মামা, একদাম পাঁচশ।”

-ধুর মিয়া, একদামের জিনিস কিনতে হইলে ফুটপাতে আইতাম?

-আচ্ছা, তিনশত দিয়েন যান।

-আগে দেখি ভাল করে।

-এই লন মামা।

বেশ খানিকক্ষণ আমাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার পর ছেলেটির চোখেমুখে কিছুটা স্বস্তি ফুটে উঠল। আমিও আমার নতুন মনিবের হাতে যাবার জন্যে হাঁসফাঁস করছিলাম।

-একশ দিবেন?

-এইটা তো রেকসিন এর মানিব্যাগের দাম কইলেন মামা, লেখাপড়া করে যদি এই কথা কন !

-ঠিক আছে , দেড়শ।

-দুইশর নিচে এক টেকাও কম হবেনা।

শেষমেশ এই পকেট ওই পকেট থেকে খুচরো টাকা বের করে ছেলেটি দুইশত টাকা দিয়ে আমাকে কিনে নিল, আমিও আমার নতুন মনিব পেয়ে খুশিতে গদগদ। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে আমাকে কিনতে গিয়ে মনিবের পকেটে আর কোন টাকাই অবশিষ্ট রইল না, আর তাই নতুন মানিব্যাগ খালি রেখেই সে পকেটে পুরে নিল। সেই থেকে আমার পথচলা, বাড়ি ফিরেই মনিব তার মা-বাবার ছবি রাখল আমার সামনের একটা পকেটে। টাকার চেয়ে অনেক মূল্যবান মনে হলো ছবিগুলো আমার কাছে। তবে আমার মূল কাজ তো টাকা রাখা, তাই টাকার সান্যিধ্য না পেতে পেতে নিজেকে কেমন একাকি লাগতো।

একদিন মনিব টিউশনির বেতন হাতে পেলেন, গুনে গুনে চারটে চকচকে পাঁচশ টাকার নোট রাখলেন আমার মূল পকেটে। সেই দু-হাজার টাকা দিয়েই আমার যাত্রা শুরু। এরপর কতো কালজয়ী ইতিহাসের সাক্ষী আমি…সবই আমার এই মনিবের সাথে। একটা পাঁচশ টাকার নোট ভাংতি করেই মনিব খুচরো টাকাগুলো রাখলেন…এভাবেই চলছিল আমাদের দেয়ানেয়া। মনিব আমার কাছে টাকা রাখতেন আর আমি সময়মতো বের করে দিতাম। সামনের একটা ছোট পকেটে খুচরো পয়সার স্তূপ জমতো, যা বাস ভাড়া দেয়ার সময় মনিবের কাজে লাগতো।

মনিব খুব বুঝেশুনে খরচ করতেন…রিক্সায় করে যাবার চেয়ে হেঁটেই টিউশনে চলে যেতেন। মাসশেষে দুয়েক হাজার টাকা জমিয়ে মায়ের হাতে দিতেন আর বাকি টাকায় নিজের লেখাপড়ার খরচ চালাতেন। মাঝেমধ্যে মনিবের মা খুচরো পয়সার প্রয়োজনে আমাকে চেক করতেন আর একদিন এক মজার কান্ড ঘটে যায়, খুচরো পয়সা খুঁজতে গিয়ে মায়ের হাতে পড়ে যায় একখানা চিঠি। মনিবের ক্যাম্পাসের সুন্দরী জুনিয়র ইতু মনিবকে একখানা পত্র লিখেছিল, আর মনিব সেই যে পকেটে রেখেছে একদম ভুলে গেছে। মায়ের কাছে বকাঝকা শুনে আর চোখের সামনে প্রিয়মানুষের চিঠির দফারফা হতে দেখে মনিব আমার উপর খুব রাগ করে বসে। আমার কি দোষ বাপু, মা’কে কি আমি যেচে পড়ে চিঠিখানা ধরিয়ে দিয়েছি?

আজ প্রায় ছ’বছর হতে চলল মনিবের সাথে আছি। আমার বহিরাবরণে ফাটল ধরেছে, টিপবোতাম খুলে পড়ে গেছে, দুয়েকটা চেন নষ্ট হয়ে গেছে, এখনো মনিব আমাকে আগের মতোই আগলে রাখেন। যদিও অধিকাংশ টাকার দায়িত্ব চলে গেছে ডেবিট কার্ডের কাছে, কার্ড থেকে মাঝেমধ্যে টাকা তুলে মনিব আমার কাছে রাখেন… আবার অধিকাংশ সময় কার্ড থেকেই খরচ করেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে সেই কার্ডও কিন্তু আমার কাছে গচ্ছিত থাকে। ও হ্যাঁ, একপাশে মনিবের বাবা-মায়ের ছবির পাশাপাশি অন্য পাশে আশ্রয় নিয়েছে আরেকটি নতুন ছবি। মনিবের মা ছবিখানা মনিবকে দিয়েছেন, পাত্রীপক্ষের সাথে কথাবার্তা গড়িয়েছে বহুদূর। দিনক্ষণ ঠিক হলেই মনিবের জীবনে নতুন সঙ্গী আসবে, আমাকে কি তখনো আগলে রাখবেন মনিব? আচ্ছা, মনিবের স্ত্রী কেমন হবে? সে আমাকে আবার ছুড়ে ফেলে দেবে না তো? যদি সে নতুন কোন মানিব্যাগ গিফট করে তাহলে কি মনিব আমাকে আর রাখবে? --- এসব আজগুবি ভাবনা চিন্তায় দিন কাটছিল আমার।

একদিন মনিব তার জমানো টাকায় একখানা মোটরবাইক কিনলেন। বাইক নিয়ে এদিক সেদিক ঘুরোঘুরি… চলছিল বেশ ভালোই। কিন্তু ওই দিনটির কথা মনে পড়লে এখনো আমার কান্না পায়। হাইওয়ে ধরে প্রচন্ড গতিতে ছুটছিল মনিবের মোটরবাইক, আমার তো ভয়ে দম বন্ধ হইয়ে গেল বলে। কিছুতেই মনিব গতি কমাচ্ছিলেন না, কি এক নেশায় পেয়ে বসেছে তাঁকে। হঠাৎ বিপরীত দিক থেকে আসা একটা মিনিবাসের ধাক্কায় মনিব ছিটকে পড়লেন রাস্তার একপাশে। মনিবের সারা শরীর রক্তে ভেসে যাচ্ছিল, সেই রক্তে লাল হয়েছি আমি নিজেও। বেশ কিছুক্ষণ পর দুয়েকজন পথচারী মনিবকে দেখতে পেয়ে মনিবের মোবাইল আর আমাকে ঘেটে পরিচয় উদ্ধার করলেন আর মনিবকে নিয়ে হাসপাতালের পথে রওনা দিলেন। হাসপাতালে পৌঁছাতে পৌঁছাতেই মনিব আমাদের সবাইকে ছেড়ে পরপারের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন।

মনিবের লাশ চলে যায় হাসপাতালের মর্গে আর পুলিশ আমাকে আর মনিবের মুঠোফোনটিকে বুঝিয়ে দেয় মনিবের মায়ের কাছে। মা সেদিন আমাকে চোখে-মুখে জড়িয়ে ধরে সে-কি কান্না। মায়ের চোখের জলে আমার গায়ে লেগে থাকা মনিবের শুকনো রক্ত মুছে যাচ্ছিল। আমিও ভেতরে ভেতরে প্রচন্ড কষ্ট পাচ্ছিলাম। প্রায় ছ’টি বছর ধরে মনিব আমাকে আগলে রেখেছেন, এখন আমি কার পকেটে স্থান নেব?

সেই থেকে আমার স্থান মনিবের রুমের শোকেসে, মনিবের ব্যাবহৃত কিছু জিনিস আর ছবির সাথে পড়ে ছিলাম বেশ ক’টি বছর। মনিবের মা যতদিন বেঁচে ছিলেন আমাকে আগলে রেখেছিলেন। এরপর দিন গেল, মাস গেল, বছর গেল…মনিবের স্মৃতি একে একে সবাই ভুলে যেতে বসল। সময়ের পরিক্রমায় আমার স্থান হলো শহরের ময়লা আবর্জনার স্তূপে। আমার শরীরের অধিকাংশই আবর্জনার সাথে মিশে গেছে, আর কিছুটা বাকি আছে …সপ্তাখানেক যেতেই পুরোপুরি মিশে যাব। শেষ হবে আমার আত্মকাহিনী।    


রবিবার, ৯ আগস্ট, ২০২০

শেষ স্টেশনের যাত্রী

 

স্বচ্ছ পানির বিশাল জলাধার…“লেক ওন্টারিও”। এরই পাড় ঘেঁষে হ্যামিল্টন শহর, প্রকৃতি আর সভ্যতার অপার মিশেল এই শহর। শহরেরই এক নামকরা বিদ্যাপীঠ “ম্যাকমাস্টার ইউনিভার্সিটি”, আবির রিসার্স এসিসট্যান্ট হিসেবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছে এক বছর হতে চলল। এর মধ্যেই শহরের অলি-গলি রাস্তাঘাট মোটামুটি সব চেনা হয়ে গেছে আবিরের। গত এক সপ্তাহ ধরে কুইন্স স্ট্রীটের ২২ নম্বর বাসার দোতলায় আবিরের মাথা গোঁজার ঠাই। প্রফেসর জাস্টিন কে বলেকয়ে এই সেশনের স্টিপেন্ড-টা হালকা বাড়ানো গেছে, আর তাই তল্পিতল্পা নিয়ে ক্যাম্পাসের কাছেই ঘাঁটি গাড়া। ডুপ্লেক্স বাড়ি, বাড়ির সামনে বিশাল লন…আর চারপাশে মেপল গাছের ছড়াছড়ি, বারান্দায় দাঁড়িয়ে লেকের প্রাণোবন্ত হাওয়ায় প্রাণটা জুড়িয়ে যায়। খানিক দূরেই নায়াগ্রা ফলস… USA-CANADA সীমান্ত। সামার ভেকেশন-এ ভ্রমণ পিপাসু মানুষে গিজগিজ করে এই শহর, অধিকাংশই আসে লেকে মাছ ধরতে। প্রচুর মাছের সমারোহ এই লেক ওন্টারিও তে… অবশ্য স্যামন মাছই ধরা পড়ে বেশি।

বিকেলে ল্যাবের কাজ চুকিয়ে লম্বা একটা নিঃশ্বাস ফেলল আবির, কাল-পরশু দুদিন ছুটি। লকার থেকে বড়শিটা নিয়ে ক্যাম্পাসের কাছের সাবওয়ে স্টেশনের উদ্দেশ্যে হাঁটা ধরল। হাঁটতে হাঁটতেই মেশিন শপের সামনেই দেখা হয়ে গেল হাসানের সাথে।

-আবির, কি খবর তোর? দিনকাল কেমন যায়?

-জ্বি ভাই, ভালো। আপনার রিসার্স কেমন চলে ভাই?

-ভাল না, বিগত দু সপ্তাহ ধরে এক জায়গায় আটকে আছি। কাজটা কিছুতেই মিলছে না, কি যে করি। ওদিকে আন্ডার-গ্রেডের পোলাপান মাথাটা খেয়ে ফেলল।

-কি আর করবেন ভাই, TA, RA দুইটাই যখন পাইতেছেন কষ্ট তো একটু হবেই।

-তা অবশ্য ঠিক। কামলা খাট, টাকা নাও। দুনিয়ার কোথাও শান্তি নাই রে।

-শান্তি আছে ভাই, মাঝেমধ্যে নেটওয়ার্ক এর বাইরে হারাই যাইতে হয়। চলেন নায়াগ্রা ফলস এর দিকে যাই, ছোট মামার ওখানে উঠব।

-মেট্রোতে যাবি? যেতেই তো দু-ঘন্টা চলে যাবে। প্রাইভেট কার থাকলে নাহয় একটা কথা ছিল।

-আপনে কিনতেছেন না কেন গাড়ি? আপনি তো মিয়া বড়লোক্স…

-কই আর ভাই… কিনব কিনব এই সামারে দেখি। মেলা কাজ জমে আছে বাসায়, আজকে তুই যা।

-আচ্ছা ভাই, আল্লাহ হাফেজ।

-হ্যাভ এ নাইচ উইক-এন্ড।

হাসান পিএইচডি স্টুডেন্ট, আবিরের সাথে একই ডিপার্টমেন্ট এ। প্রফেসর জাস্টিন এর ফান্ডিং পেতে এই হাসান ছেলেটা খুব সাহায্য করেছিল আবিরকে। আবির আর হাসান দুজনই আবার জাস্টিন এর ল্যাবে কাজ করে, চলমান গাড়ির ইঞ্জিনের ফল্ট ডিটেকশান ও কারেকশান নিয়ে কাজ করছে তারা। এই ল্যাবে আছে আরো দুজন, একজন ইন্ডিয়ান…আরেকজন কানাডিয়ান। আবির এমনিতে খুব অলস হলেও যখন কোন কিছুতে মন দেয় তার শেষ দেখেই ছাড়ে, হয় এস্পার নয় ওস্পার।

পাঁচ মিনিট হেঁটেই ক্যাম্পাস থেকে একটু দূরে সাবওয়ে স্টেশনে এসে দাঁড়ায় আবির। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতেই ৩ নম্বর সাবওয়ে ধরে এসে থামে একটি নীল মেট্রো, আর খুলে যায় বগিগুলোর স্বয়ংক্রিয় দরজা। বরাবরই আবিরের জানালার পাশের সিট পছন্দ, এখানে অবশ্য প্রায় সিটই খালি থাকে। এমনও হয়েছে পুরো খালি বগিতে একা একজন, গন্তব্য শেষ স্টেশন। আবিরের কামরায় যে দু-চারজন উঠেছিল তারা পরের স্টপেজেই নেমে গেল। "হ্যামিল্টন গো সেন্টার" স্টপেজ আসতেই আবিরের পুরো বগি খালি হয়ে গেল, বগিতে একা আবির। সবেমাত্র বিশ মিনিট পেরিয়েছে, পাড়ি দিতে হবে আরো ঘন্টাখানেকের পথ। মেট্রোর সর্বশেষ স্টপেজ "স্ট্যানলী এভে", এর কাছেই আবিরের ছোটমামার বাড়ি। দুটো দিন জমিয়ে মামাবাড়ি কাটিয়ে, মাছ ধরে আর জলপ্রপাত উপভোগ করে আবার ক্যাম্পাসে ফেরা যাবে ক্ষণ।  

এসব ভাবতে ভাবতেই আবিরের চোখ দুটো বুজে আসে, সন্ধ্যের আবছা আলো-আধারীর খেলা দেখতে দেখতে চোখের সামনে ভেসে উঠে ফেলে আসা দিনগুলো। সাড়ে বারো হাজার কিলোমিটার দূরের সেই সমুদ্র সৈকত… বালুকাময় সৈকতে ফেলে আসা শৈশব। নদীর জলে অবিরাম দাপাদাপি আর নদীর মোহনার সেই সুশীতল হাওয়া। সাগর পাড় ধরে দ্বিচক্রযানে অজানার পথে ছুটে চলা কিংবা ঝাউয়ের সারির মাঝে চুপটি করে একাকি বসে থাকা। বাতাসে পতপত করে বইয়ের পাতা উল্টানোর মতোই একে একে ভেসে উঠছিল তার সব ফেলে আসা স্মৃতি।

খুব ছোটবেলায় যখন আবির প্রাথমিকে পড়ছিল, তখন চেয়ছিল সে বড় হয়ে দোকানী হবে। পাড়ার মোড়ে ছোটখাট একটা দোকান দেবে, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস বেঁচে দু-চার পয়সা যা আয় হবে তাতেই কোন রকমে চলে যাবে। এই লক্ষ্যে পাড়ার ছেলেপিলেদের সাথে মিলে রোজার ঈদের আগে ঈদ কার্ড, খেলনা আর লটারির দোকান সাজিয়ে বসত আবির। তারপর যখন একটু বড় হলো, সিন্দাবাদ আর ম্যাকগাইভারের ভুত মাথায় চেপে বসল। সিন্দাবাদের মতো নাবিক হয়ে সে আরব সাগর পাড়ি দিতে চায় আবার ম্যাকগাইভারের মতো মাথা খাটিয়ে সমাধান করতে চায় নিত্যদিনকার সমস্যা। আরেকটু যখন বড় হলো তখন মাথায় চেপে বসল গোয়েন্দাগিরির ভূত, তিন গোয়েন্দা…মাসুদ রানা…ফেলুদা, এসব পড়েই দিন কাটছিল তার। কখনো কখনো হেনরি রাইডার হ্যাগার্ড কিংবা উইলবার স্মিথের বই পড়তে পড়তে আবির স্বপ্ন দেখত আফ্রিকার জলে জঙ্গলে অভিযাত্রিক হয়ে ঘুরে বেড়ানোর। আবার কখনোবা জীবনানন্দ-সুকান্তের কবিতায় ডুব দিয়ে হতে চাইতো নিতান্তই প্রকৃতি আর মানুষপ্রেমী একজন লেখক কিংবা কবি। আবার কলেজে উঠে ন্যাশনাল ক্যাডেট কোরে নাম লিখিয়ে স্বপ্ন দেখতে থাকে ডিফেন্স অফিসার হওয়ার। পাশাপাশি চলছিল ক্রিকেট একাডেমীতে ক্রিকেট অনুশীলন আর অবসরে ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রপাতি নিয়ে গুঁতোগুঁতি।

একে একে সব স্মৃতিগুলো স্বচ্ছ জলের মতোই ভেসে উঠছিল আবিরের চোখের সামনে, সিটের পাশের জানালায় মাথা এলিয়ে দিতেই ঈষৎ ঠান্ডা অনুভব করলো আবির… “বাইরে কি বৃষ্টি পড়ছে, নাকি তুষার ! উহু, চোখ খুলতে মন চাইছে না। যাকগে, যা হয় হবে একটা” – মনে মনে ভাবছিল আবির। জানালার কাঁচের স্পর্শে ঠান্ডা হয়ে গেল আবিরের গাল, জ্যাকেটের ভেতর নিজেকে গুটিয়ে নিল সে, ঠিক যেমন কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল। স্নাতকের দিনগুলিতে বন্ধু-আড্ডা-পাড়ার ক্রিকেট সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে নেমে পড়ে একনিষ্ঠ সংকল্পে… সেই ম্যাকগাইভার এর মতো প্রযুক্তি দিয়ে সমস্যা সমাধানের নেশা।  

মাঝপথে বাঁধা এসেছিলো অনেক, এক পর্যায়ে ক্লান্ত পরিশ্রান্তও হয়ে পড়েছিল বটে। উপর ওয়ালা অবশ্য সহায় ছিলেন, আর তাঁরই কৃপায় স্নাতক শেষ হতে না হতেই মিলে যায় মনমতো একখানা চাকুরি। বাড়ি থেকে বেশ দূরে আঁকাবাঁকা আর উঁচুনিচু পথ বেয়ে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে সেই গবেষণাগার, রিসার্স ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে সেই প্রথম চাকুরি আর খেয়ালখুশি মতো গবেষণা কার্যক্রম। ঠিক যেমনটা আবির মন থেকে চেয়েছিল, তেমন মনের মতো কর্মস্থল। কিন্তু সেই কর্মস্থলে বছর ঘুরতে না ঘুরতেই কেমন একঘেয়েমি চলে আসে আবিরের। অধিকাংশ সহকর্মী একে একে বিদায় নিতে নিতে মাত্র তিনজন দিয়ে গবেষণা কার্যক্রম খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছিল। হঠাৎ চোখের সামনে ভেসে উঠে সেই কর্মস্থলের বসের চেহারা…

-কি, আবির সাহেব? আপনাকে যে একটা ডিভাইস দিয়েছিলাম সেটা কি টেস্ট করছেন?

-জ্বি স্যার। -ঘুমের ঘোরে বিড়বিড় করে বলছিল আবির।

-তারপর সেটা সেন্ট্রাল অফিসে ইন্সটল করছেন?

-জ্বি স্যার।

-ইন্সটল করার পর একবারও কি গিয়ে দেখে আসছেন, কি অবস্থা ওটার?

-না স্যার।

-এইতো, এই হচ্ছে যে আপনাদের সমস্যা। একটা কাজও ঠিকমতো করতে পারেন না, তার উপর যা নিজেরা বানান সব হচ্ছে খেলনা প্রজেক্ট। চলতে চলতে হুট করে বিগড়ে যায়।

“ধুচ্ছাই, নামকরা ম্যানুফ্যাকচারিং আর কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর থেকে দু-চারখানা জব অফার কোন দুঃখে যে হাতছাড়া করেছিলাম”- মনে মনে নিজেকে গালমন্দ করছিল আবির। স্যারের বকুনি খেলে আর কাজ করতে করতে হাঁপিয়ে উঠলেই আবিরের এসব চিন্তা হয়, কিন্তু বাবা-মায়ের কাছেই থেকে এই ছোটখাটো চাকরি তার কাজে ন’টা-পাঁচটার ভাল মাইনের কর্পোরেটের চেয়ে মহামূল্যবান। যেতে যদি হয় এর চেয়ে ঢের ভালো গবেষক হয়ে দূরে বহুদূরে কোথাও চলে যাওয়া, নিত্যদিনকার ঘরোয়া নানা সমস্যা আর অর্থসংকট দিন দিন আবিরকে আরো গুটিয়ে দিতে থাকে। গবেষণা, উচ্চশিক্ষা, পরিবার, ম্যাকগাইভারি কাজকর্ম আর অফিস, অথৈ সাগরে একখানা কাঠের টুকরার উপর ভেসে আছে যেন সে নির্জন একাকীত্বে।  

হঠাৎ আবিরের ঘুম ভেঙ্গে যায় মেট্রোর স্পীকারে ভেসে আসে তীব্র হুইসেলে আর মোটা গলার এক পুরুষকণ্ঠ…

-Everyone please keep seated and grab stable things around you. There is a fault in our engine and this vibration is the effect. We are solving the issues as early as possible.

কিন্তু ঝাঁকুনির পরিমাণটা ক্রমশই বাড়ছে, এভাবে চুপটি করে বসে থাকলে কি না কি অঘটন ঘটে যায় আল্লাহই জানে। তাড়াতাড়ি সিট থেকে উঠে ইঞ্জিন রুমের দিকে এগুতে থাকল আবির। দায়িত্বরত অফিসার আর চালককে অনেক পরিশ্রম করে বোঝাতে সমর্থ হলো যে, ইঞ্জিনের ফল্ট ডিটেকশান নিয়ে সে কাজ করছে। সম্মতি পেয়েই হাতের স্মার্টওয়াচ এর সাথে একটা কেবল কানেক্ট করলো। বেশ খানিক্ষণ কয়েকটা এপস নিয়ে এনালাইসিস করার পর পাঁচ মিনিটের মাথায় অবশেষে ইঞ্জিনের সমস্যা বের করতে সমর্থ হলো আবির। আবার ঠিকঠাক প্রোগ্রাম করে দিতেই সমস্যার সমাধান হয়ে গেল, ঝাকুনিও কমে গেল। ইঞ্জিনরুমে থাকা প্রকৌশলী, চালক আর নিরাপত্তাকর্মীদের সাথে সাথে যাত্রীরাও সমোস্বরে বিজয়ধ্বনি দিলো, পিঠ চাপড়ে দিচ্ছিল আশে পাশের কয়েকজন।

এবারো আবির নিজেকে সবার থেকে গুটিয়ে নিতে নিতে অনুভব করছিল কে যেন তাকে পিঠে হাত দিয়ে ডাকছে ……

-অই মামা, উঠেন। আর কতো ঘুমাইবেন?  শেষ স্টেশন আইসা পড়ছে, নামেন নামেন। 

 

- এহসান সানি
৮/৯/২০২০ 

বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২০

ট্রানজিস্টর

তাড়াহুড়োয় কলমটা ফেলে এসেছে আবীর। পাশের সুন্দরী মেয়েটির কাছে কলম চেয়ে কিছুটা লজ্জিত হলো সে, কেমন বাঁকা চোখে তাকাল মেয়েটা । যদিও কলম দিল মেয়েটি, কলমে ছিল বার্বি ডলের স্টিকার লাগানো। আমতা আমতা করে আবীর বলল
-“ধন্যবাদ। আমি আবীর, বিএফ শাহীন
-“হা...হা...হা , অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল মেয়েটি। বি...এফ ???  এমন প্রাণখোলা হাসি আবীর কখনো দেখেনি । হাসি থামিয়ে মেয়েটি বলল আমি রামিসা। এক্স ক্যান্ট পাবলিক
ক্লাসে হাতে গুনা গোটা পাঁচেক মেয়েদের মধ্যে রামিসা অন্যদের চেয়ে একটু আলাদা। হাসিখুসি-প্রাণোচ্ছোল , অনেক ফ্রেন্ডলি। বাবা মায়ের ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে এসেছে। তাদের স্বপ্ন ছিল, মেয়ে একদিন ডাক্তার হবে। কি না কি, পান্তা ভাতে ঘি ।
এদিকে আবীর বাবা-মায়ের বাধ্য ছেলে। বাবা নামকরা ইঞ্জিনিয়ার, তাই তাকেও ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে – ইহাই যেন বিধির লিখন। তো বিধির লিখনকে খন্ডাতেই হোক কিংবা তাহা শিরোধার্য রাখবার জন্যেই হোক , আজ তারা দুজনই নামকরা এক বিশ্ববিদ্যালয়ে।
ক্লাসের সবচেয়ে দুষ্টু ছেলে রকি। এমন কোন কাজ বাকি নাই রকি করতে পারে না। তবে অফ প্রিয়ডে পুরো ক্লাসকে মাতিয়ে রাখার জন্যে সে একাই যথেষ্ঠ । এভাবেই হাসি আড্ডা মজায় কিভাবে কিভাবে যেন চলে যায় একটি সেমিস্টার। রামিসা ও আরো ৪-৫ জন ছেলে কেবল সব বিষয়ে পাশ করতে পারল। আর বাকিরা সবাই কোনটা না কোনটাতে গেছে ।
এভাবে নিয়মিত বোরিং ক্লাস লেকচার, এসাইনমেন্ট , ল্যাবের প্যারায় তাদের প্রায় সবারই যায় যায় অবস্থা। অনেকেই মুখ ফুটে তেমন কিছু বলে না, একবার যেহেতু শুরু করেছে এর শেষ দেখেই ছাড়বে। তবে রকি আর সবার থেকে আলাদা... সে প্রতিনিয়তই ডিন স্যারকে বলে – স্যার প্রেসার ইক্যুয়েলস টু , ফোর্স বাই এরিয়া তো স্যার। আর কত ??
দিন যায় দিন আসে , ছোট ছোট কিছু হাসি আড্ডা গল্পে মুখর হয়ে উঠে এই ব্যাচের ছাত্রছাত্রীরা। নানান কিছিমের মানুষে গড়া এই ২০তম ব্যাচ। কেউ এক বছর ড্রপ দিয়ে ভর্তি হয়েছে, কেউবা দু বছর। আবার কেউবা চাকুরি করে পড়ালেখা করছে। কেউ কেউ ৪-৫ টিউশনি কিংবা কোচিং এ ক্লাস নিতে ব্যাস্ত। সবচেয়ে মজার বিষয়, এই ব্যাচে বিবাহিত ছেলেই আছে দুই দুইটা, অধিকাংশ ব্যাচেলর ছেলে এদের কাছে দীক্ষা নিয়ে থাকে।  
রামিসা আর আবীরের মধ্যে বন্ধুত্ব দিন দিন জমতে থাকে। যথারীতি ফাইনাল ইয়ার এর প্রজেক্ট সাবমিট করার তারিখ পড়ে এই ২০তম ব্যাচের, আর কাকতালীয়ভাবে আবীর-রামিসা পড়ে একই গ্রুপে। তাদের প্রজেক্টটাও খুব দারুণ হয়। প্ল্যানিং থেকে শুরু করে সবকিছুই তারা হাতে হাতে করেছে । তো অন্য সব প্রজেক্ট থেকে তাদের টাই সেরা বিবেচিত হলো ।
একদিন তাদের শেষ সেমিস্টারটিও চলে গেল, RAG ডেও হইয়ে গেল বেশ বড়সড় আয়োজনে ...। প্রত্যেকে অশ্রুভরা নয়নে তাদের সহপাঠীদের বিদায় দিল বিষ্ববিদ্যালয় জীবনের শেষ দিনটিতে।
এরপর দিন যায় দিন আসে, যে যার মতো কর্মক্ষেত্রে যোগ দিতে লাগল একে একে
অনেকদিন পর সমাবর্তনে দেখা হলো আবীর আর রামিসার । দুজনের বন্ধুত্ব ঠিক আগের মতোই আছে , তবে কেউ কাউকে ভালবাসি কথাটি বলতে পারেনি । আবীর বলল ,
-“আচ্ছা রামিসা – একটা উত্তর দিবে ? ফাইনাল ইয়ারের প্রজেক্টের শেষে তোমাকে যে ট্রানিজিস্টর টা দিয়ে বলেছিলাম ৭ নং পিনের সাথে কমন বেস কানেকশন দিতে, দিছিলা ?”
একটু ভেবে রামিসা বলল,
-“দিছিলাম তো, বাট ট্রানিজিস্টর টা তো পুড়েই গেল” ।
অনেকটা ব্যাথা বুকে নিয়ে বিদায় নিয়ে চলে যায় আবীর। বেশ কদিন পর রামিসা সেই ট্রানজিস্টর আরেকটা বাজার থেকে এনে ঠিকঠাকভাবে সংযোগ দেয় । ডিসপ্লে তে চোখ রেখে চোখের অশ্রু ধরে রাখতে পারে না, I LOVE YOU লেখা। দ্রুত পায়ে বেরিয়ে যায় রামিসা। কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গেছে । আবীর সকল পিছুটান ছিন্ন করে স্কলারশীপ নিয়ে চলে গেছে দেশ ছেড়ে।


জীবনবোধ


এক

দুপুরের খাঁ খাঁ রোদ , মাত্রই স্কুল ছুটি হলো । স্কুল থেকে নুহাস বাড়ি ফিরছে , বাড়ি ফেরার পথে পুকুরে ওর বয়সী ছেলেপিলেদের দাপাদাপি দেখে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে ।

-আহ , কতই না মজা করছে এরা । কিন্তু মা কেন যে সব সময় কলের পানিতেই গোসল করতে বলে। আচ্ছা, ওদের যদি গিয়ে বলি , আমাকে কি ওরা একটু নাইতে দেবে ? আচ্ছা মাছও তো ধরতে পারব বোধ হয় ,

বইতে যেমনটি পড়েছি – আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে , বাঁকে ...... বৈশাখ মাসে তার হাটু জল থাকে

সকালে বিকালে কভু নাওয়া হলে পরে, ............ আঁচলে ছাকিয়া তারা ছোট মাছ ধরে  //

কিন্তু নদী তো কখনোই দেখলাম না , পুকুর আর নদীতে তাহলে তফাৎটা কি খানিক বাদেই পেছন থেকে নুহাস কে ডেকে উঠে সাব্বির ...

-নুহাস, দাঁড়িয়ে আছিস কেন ? দুপুরে কোচিং আছে তো । আজকে না আবার গ্রামার এক্সাম আছে- যাবি না ? চল।

-আরে দাঁড়া, এক্সাম তো প্রায়ই থাকে, কতই বা মার্কস পাই । আমার কখনোই হায়েস্ট মার্ক পাওয়া হয়ে উঠবে না ।

আচ্ছা সাব্বির , তুই কি কখনো নদী দেখেছিস ?

-হ্যাঁ, আমরা যখন ঈদে বাড়ি যাই লঞ্চেই যাই। তখন দেখি।

-অনেক সুন্দর, নারে ? বাঁকে বাঁকে বয়ে চলে । আমাদের বাড়িই তো এইখানে , আব্বুও কখনো তেমন কোথাও নিয়ে যায়নি।

- আচ্ছা চল এখন । কাল তো ফ্রাইডে , কম্পিউটারে “কল অব ডিউটি” খেলব । আব্বু কালই গেমস এর সিডি-টা এনে দিল ।

সূর্যের কিরণ সামান্য হেলে পড়ে প্রস্ফুটিত করে আছে চারদিক । রাস্তা ধরে বাড়ির পানে হাটতে হাটতে নুহাসের মনে উকি দিয়ে বেড়ায় খালি গায়ে পুকুরে লাফ দেয়ার স্বপ্ন – কি যেন চিন্তে করে জামার দুটো বোতামও খুলেছিল । কিন্তু স্বপ্ন যে স্বপ্নই থেকে গেল। 

সন্ধ্যেয় নুহাসের হোম টিউটর রায়হান স্যার এলো । রায়হান স্যারকে নুহাসের খুব ভাল লাগে । তাঁর সহজ-সরল মন্ত্রমুগ্ধ কথা আর কোমল-কঠোর শাসন তাকে সত্যিই বিষ্মিত করে।

-আচ্ছা স্যার ? মানুষ মরে গেলে কি পঁচে যায় ?

-হুম , হঠাৎ এই প্রশ্ন ?

- না মানে আমরা মাটিকে এতো অবহেলা করি তো – তাই বুঝি মাটি আমাদের পঁচিয়ে দেয় ।

- না নুহাস । আসলে মাটিতে কিছু ব্যাকটেরিয়া থাকে , যা প্রাণীদেহ পঁচাতে সাহায্য করে।

- না স্যার । গায়ে সামান্য ধুলা লাগলে আম্মু যা বকা দেয়, মাটি তখন খুব কষ্ট পায় । আর তাই ব্যাকটেরিয়া ডেকে আমাদের পঁচিয়ে দেয় ।

- সত্যি বলতে কি নুহাস, আমরা সবাই মাটির মানুষ – আমাদের একদিন মাটিতেই মিশে যেতে হবে।

- তাহলে বিকালে কোচিং থেকে আসতে দেখলাম, ছেলেরা ধুলোবালি গায়ে ফুটবল খেলছে। এরাও তো মাটিতে মিশে আছে। এদের কি মাটি ব্যাকটেরিয়া দিয়ে আবার মিশিয়ে দেবে ?

............প্রশ্নটির উত্তর রায়হান দিতে পারে না। কেবল নিশ্চুপ হয়ে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে নুহাসের দিকে।

 

দুই

ইদানিং পড়ালেখায় আর মন বসে না রাইসার। মনের মধ্যে কি যেন এক পরিবর্তন সে অনুভব করতে পারে, কিন্তু কাউকে খুলে বলতে পারে না। বাড়িতে যে সে বড্ড একা। ছোটবেলায় মায়ের মৃত্যুর পর সৎ মা যে তাকে বলতে গেলে একেবারেই কাছে টেনে নেয়নি । আর তাই সন্ধ্যে হলেই পছন্দের টিভি সিরিয়ালগুলোই তার নিত্য দিনের সঙ্গী ।

হঠাৎ রাইসার ফোন বেজে উঠল , তার সহপাঠী কনিকা ।

-হ্যালো , রাইসা ।

-হুম, ভালো আছিস ?

-হুম , কি করিস রে ?

- এইতো, সিরিয়াল দেখি। “বোঝেনা সে বোঝেনা” ।

- দোস্ত , আর বলিস না । আজকে অরণ্য কে যা হ্যান্ডসাম লাগছে না মাইরি ।

- তোর ভাষার কি ছিরি রে এসব ?

-আর বলিস না , দিন দিন ওদের মতো হয়ে যাচ্ছি ।

- আচ্ছা শোন , কাল তোর সাথে কথা আছে ।

হঠাৎ মায়ের চিৎকার ......... হারাদিন কি গুজুর গুজুর , ফুসুর ? তোর বাপে কি এড়ে চর পোয়া লাই গেইয়ে নে তরাতড়ি আই নি চুলেত ভাত বোয়া । ভাত বোয়াই নি সবজি গিন কুডি ল । আই নাটক গো চাই লই ।

-জি আম্মু।

অসহায় দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ টিভির দিকে তাকিয়ে থেকে একখানা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে উঠে যায় রাইসা।

পরদিন সকালে............

-কনিকা, বেশ কদিন ধরে আমার না কেমন অস্বস্তি লাগছে। ঠিকমত খাওয়া দাওয়া হয় না, ঘুম হয়। নিজেকে কেমন যেন অচেনা লাগে ।

-আরে বুঝিস না। এই বয়স এ ও রকম হয়। কেন তোর আম্মু তোরে কিছু বলে নাই ?

-না রে, সেইদিন পেটব্যাথা করছিল // বলল – ফকির বাবার কাছ থেকে পানি পড়া আনি খা।

-আচ্ছা, তুই তো আমাদের শারিরীক শিক্ষা আপার কাছ থেকে পরামর্শ নিতে পারি। জানিস না ? কিশোরী স্বাস্থ্য উন্নয়নের লক্ষ্যে স্কুলভিত্তিক কার্যক্রম এ আপা সংযুক্ত আছে ।

-ও......... তাই নাকি ? আচ্ছা। ভালই হলো তাহলে বল ।

হঠাৎ শিক্ষক এসে পড়ায় ক্লাসে শুনশান নীরবতা নেমে আসে। রফিক স্যার অন্যান্য দিনের মতোই নাম ডাকা শেষে মার্কার নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। হঠাৎ কি মনে করে বলে উঠলেন –

-আচ্ছা আমরা তো সব সময়ই বই এর পড়া পড়ি, আজ একটু জীবনবোধ নিয়ে আলোচনা করি ।

গতানুগতিক বোর্ডের লেখা তোলা থেকে ছুটি পেয়ে শিক্ষার্থীরা যেন হাঁফ ছেড়ে বাচল। ছাত্রছাত্রীদের নিজেদের মধ্যে কথা বলতে দেখে স্যার বললেন,

-আচ্ছা, তোমরা কি লেখাপড়ার প্রকৃত উদ্দেশ্য জান ? কেনই বা আমরা বিদ্যালয়ে আসি ? পড়াশুনা করি কি শুধু একটু ভালভাবে বেঁচে থাকার জন্যে ? নাকি প্রকৃত মানুষ হবার  জন্যে ?

শিক্ষার্থীরা নিশ্চুপ , তাদের মধ্যে ভাবোদয় হয়েছে । শিক্ষক প্রত্যেকের কাছ থেকে তাদের মতামতটুকু জানতে চাইলেন।

এরপর শেষে পরবর্তী ক্লাসের জন্য একখানা ছোট কাজ দিলেন।

-ধর তোমাদের একটি খালি কাচের জার দেয়া হলো । আর দেয়া হলো কিছু নুড়ি,পাথর আর বালি । কিভাবে জারটি পরিপূর্ণ করে ভর্তি করতে পারবে যাতে কোন উপাদান অবশিষ্ট না থাকে ? আমাদের জীবনটা যদি এই কাচের জার হয় তবে এই নুড়ি, বালি আর পাথরগুলো জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই কাজটা ভালোভাবে করতে পারলে জীবনবোধ নিয়ে তোমাদের ধারণা আরও স্পষ্ট হবে।

 

সেদিনের মতো ক্লাস শেষ। শিক্ষার্থীরা প্রত্যেকেই যে যার মত ভাবনায় লেগে পড়ল, আর রাইসা নুড়ি , বালিআর পাথর জোগাড় করতে বাইরে গেল । রাস্তার  পাশের ঐ নির্মাণাধীন ভবনের পাশে বেশ কিছু  নুড়ি,বালি আর পাথরের স্তূপ ছিল। রাইসা আনমনে নুড়ি কুড়াচ্ছিল । আচমকা.........

-দোস্ত,পাখি টা না সেইরম। দেখ দেখ বাসা বানাইবো বইলা নুড়ি কুড়াচ্ছে। ল চল ।

- তেরি ফটো কো সিনে সে ইয়ার , চুপ কালে ছাইয়া......

-ফেবিকল সে.........

-ঐ মাইয়া, নুড়ি লাগব নি নুড়ি ? আহো, আমার কাছে নুড়ি আছে, চুনি আছে , মুক্তা আছে। আরে যাও কই ?

-দোস্ত, ডরাইছে । ল , পিছু লই ।

-আরে যাও কই ?

রাইসা প্রাণপণে ছুটে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেল। যেতে যেতে গায়ে পড়ল বখাটেদের ছুড়ে দেয়া বেশ কিছু নুড়ি পাথর।

বাসায় এসে রাইসা অঝোরে কাঁদতে লাগল। তাঁর মনে হাজারো প্রশ্নের ভীড়- এই কি তবে কাঁচের জারে বন্দী জীবন ? এই কি আমাদের সমাজ ?

 

তিন

পাঁচটি বছর কেটে গেছে। নুহাস-সাব্বির-রাইসা-কনিকা প্রত্যেকেই এখন সদ্য উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডী পেরোনো চার  তরুণ-তরুণী। একটি বিবাহের অনুষ্টানে তাদের দেখা.........কনিকা প্রথমেই শুরু করে,

-সাব্বির, কি ভাবছিস রে ? আমাদের রেজাল্ট তো তেমন ভাল হলো না ।

-আব্বু বলল, বিদেশ পাঠিয়ে দেবে। সে লক্ষ্যেই প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। কিন্তু হঠাৎ আব্বু হার্ট এটাক করে বসল;

-কি বলিস ? তাহলে তো আঙ্কেল এর পাশে থাকাটাই বেস্ট হবে।

এরই মধ্যেই ভাবুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা নুহাসের দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দেয় কনিকা।

-কিরে, তোর কি চিন্তা ভাবনা ? আর কত বাধ্য ছেলে হয়ে থাকবি ? এখন অন্তত কিছু একটা তো ডিসিশন নিজে নে-

-কেমনে নেই ? আব্বা বলে রাখছে ডিফেন্স এ জব পাইতেই হবে,পরিবারের হাল ধরা লাগবে।

-তো এটেন্ড কর।

-কিন্তু আমি তো স্বপ্ন দেখতাম শৃঙ্খলহীন মুক্ত-স্বাধীন জীবনের। আর এ লক্ষ্যেই মনের কোণে লালন করে এসেছি ভার্সিটি তে পড়ার স্বপ্ন। মনে আছে তোদের, স্যারের সেই নুড়ি,বালি,পাথর আর খালি জার ? এখনো পরিপূর্ণ করতে পারলাম না রে ।

-আচ্ছা কনিকা, তোর কি ভাবনা-চিন্তা । বন্ধু নুহাস কথা বলতে বলতে ভাবুক হয়ে পড়ায় পরিস্থিতির সামাল দিতে প্রশ্ন করে বসে সাব্বির।

-আমার ইচ্ছে ছিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার, কিন্তু বাবার ইচ্ছে মেয়েকে ডাক্তার বানাবে।

রাইসা প্রথম থেকেই নীরব । তাঁর জীবন নামক কাঁচের জারটার ঢাকনা যে এঁটে গেছে ........

 

                  ----------------------------------------- ০ ---------------------------------------


অরুণোদয়

তখন মধ্যরাত, কাজ শেষ করে ব্যাগপত্র নিয়ে ল্যাব থেকে বেরুচ্ছিলেন প্রফেসর ডক্টর অরুণ। বিগত নয়টা মাস প্রচুর খাটুনি গেছে তার উপর দিয়ে। শিক্ষার্থী...