স্বচ্ছ পানির বিশাল জলাধার…“লেক ওন্টারিও”। এরই পাড় ঘেঁষে হ্যামিল্টন শহর, প্রকৃতি আর সভ্যতার অপার মিশেল এই শহর। শহরেরই এক নামকরা বিদ্যাপীঠ “ম্যাকমাস্টার ইউনিভার্সিটি”, আবির রিসার্স এসিসট্যান্ট হিসেবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছে এক বছর হতে চলল। এর মধ্যেই শহরের অলি-গলি রাস্তাঘাট মোটামুটি সব চেনা হয়ে গেছে আবিরের। গত এক সপ্তাহ ধরে কুইন্স স্ট্রীটের ২২ নম্বর বাসার দোতলায় আবিরের মাথা গোঁজার ঠাই। প্রফেসর জাস্টিন কে বলেকয়ে এই সেশনের স্টিপেন্ড-টা হালকা বাড়ানো গেছে, আর তাই তল্পিতল্পা নিয়ে ক্যাম্পাসের কাছেই ঘাঁটি গাড়া। ডুপ্লেক্স বাড়ি, বাড়ির সামনে বিশাল লন…আর চারপাশে মেপল গাছের ছড়াছড়ি, বারান্দায় দাঁড়িয়ে লেকের প্রাণোবন্ত হাওয়ায় প্রাণটা জুড়িয়ে যায়। খানিক দূরেই নায়াগ্রা ফলস… USA-CANADA সীমান্ত। সামার ভেকেশন-এ ভ্রমণ পিপাসু মানুষে গিজগিজ করে এই শহর, অধিকাংশই আসে লেকে মাছ ধরতে। প্রচুর মাছের সমারোহ এই লেক ওন্টারিও তে… অবশ্য স্যামন মাছই ধরা পড়ে বেশি।
বিকেলে ল্যাবের কাজ চুকিয়ে লম্বা একটা নিঃশ্বাস ফেলল আবির, কাল-পরশু দুদিন ছুটি। লকার থেকে বড়শিটা নিয়ে ক্যাম্পাসের কাছের সাবওয়ে স্টেশনের উদ্দেশ্যে হাঁটা ধরল। হাঁটতে হাঁটতেই মেশিন শপের সামনেই দেখা হয়ে গেল হাসানের সাথে।
-আবির, কি খবর তোর? দিনকাল কেমন যায়?
-জ্বি ভাই, ভালো। আপনার রিসার্স কেমন চলে ভাই?
-ভাল না, বিগত দু সপ্তাহ ধরে এক জায়গায় আটকে আছি। কাজটা কিছুতেই মিলছে না, কি যে করি। ওদিকে আন্ডার-গ্রেডের পোলাপান মাথাটা খেয়ে ফেলল।
-কি আর করবেন ভাই, TA, RA দুইটাই যখন পাইতেছেন কষ্ট তো একটু হবেই।
-তা অবশ্য ঠিক। কামলা খাট, টাকা নাও। দুনিয়ার কোথাও শান্তি নাই রে।
-শান্তি আছে ভাই, মাঝেমধ্যে নেটওয়ার্ক এর বাইরে হারাই যাইতে হয়। চলেন নায়াগ্রা ফলস এর দিকে যাই, ছোট মামার ওখানে উঠব।
-মেট্রোতে যাবি? যেতেই তো দু-ঘন্টা চলে যাবে। প্রাইভেট কার থাকলে নাহয় একটা কথা ছিল।
-আপনে কিনতেছেন না কেন গাড়ি? আপনি তো মিয়া বড়লোক্স…
-কই আর ভাই… কিনব কিনব এই সামারে দেখি। মেলা কাজ জমে আছে বাসায়, আজকে তুই যা।
-আচ্ছা ভাই, আল্লাহ হাফেজ।
-হ্যাভ এ নাইচ উইক-এন্ড।
হাসান পিএইচডি স্টুডেন্ট, আবিরের সাথে একই ডিপার্টমেন্ট এ। প্রফেসর জাস্টিন এর ফান্ডিং পেতে এই হাসান ছেলেটা খুব সাহায্য করেছিল আবিরকে। আবির আর হাসান দুজনই আবার জাস্টিন এর ল্যাবে কাজ করে, চলমান গাড়ির ইঞ্জিনের ফল্ট ডিটেকশান ও কারেকশান নিয়ে কাজ করছে তারা। এই ল্যাবে আছে আরো দুজন, একজন ইন্ডিয়ান…আরেকজন কানাডিয়ান। আবির এমনিতে খুব অলস হলেও যখন কোন কিছুতে মন দেয় তার শেষ দেখেই ছাড়ে, হয় এস্পার নয় ওস্পার।
পাঁচ মিনিট হেঁটেই ক্যাম্পাস থেকে একটু দূরে সাবওয়ে স্টেশনে এসে দাঁড়ায় আবির। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতেই ৩ নম্বর সাবওয়ে ধরে এসে থামে একটি নীল মেট্রো, আর খুলে যায় বগিগুলোর স্বয়ংক্রিয় দরজা। বরাবরই আবিরের জানালার পাশের সিট পছন্দ, এখানে অবশ্য প্রায় সিটই খালি থাকে। এমনও হয়েছে পুরো খালি বগিতে একা একজন, গন্তব্য শেষ স্টেশন। আবিরের কামরায় যে দু-চারজন উঠেছিল তারা পরের স্টপেজেই নেমে গেল। "হ্যামিল্টন গো সেন্টার" স্টপেজ আসতেই আবিরের পুরো বগি খালি হয়ে গেল, বগিতে একা আবির। সবেমাত্র বিশ মিনিট পেরিয়েছে, পাড়ি দিতে হবে আরো ঘন্টাখানেকের পথ। মেট্রোর সর্বশেষ স্টপেজ "স্ট্যানলী এভে", এর কাছেই আবিরের ছোটমামার বাড়ি। দুটো দিন জমিয়ে মামাবাড়ি কাটিয়ে, মাছ ধরে আর জলপ্রপাত উপভোগ করে আবার ক্যাম্পাসে ফেরা যাবে ক্ষণ।
এসব ভাবতে ভাবতেই আবিরের চোখ দুটো বুজে আসে, সন্ধ্যের আবছা আলো-আধারীর খেলা দেখতে দেখতে চোখের সামনে ভেসে উঠে ফেলে আসা দিনগুলো। সাড়ে বারো হাজার কিলোমিটার দূরের সেই সমুদ্র সৈকত… বালুকাময় সৈকতে ফেলে আসা শৈশব। নদীর জলে অবিরাম দাপাদাপি আর নদীর মোহনার সেই সুশীতল হাওয়া। সাগর পাড় ধরে দ্বিচক্রযানে অজানার পথে ছুটে চলা কিংবা ঝাউয়ের সারির মাঝে চুপটি করে একাকি বসে থাকা। বাতাসে পতপত করে বইয়ের পাতা উল্টানোর মতোই একে একে ভেসে উঠছিল তার সব ফেলে আসা স্মৃতি।
খুব ছোটবেলায় যখন আবির প্রাথমিকে পড়ছিল, তখন চেয়ছিল সে বড় হয়ে দোকানী হবে। পাড়ার মোড়ে ছোটখাট একটা দোকান দেবে, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস বেঁচে দু-চার পয়সা যা আয় হবে তাতেই কোন রকমে চলে যাবে। এই লক্ষ্যে পাড়ার ছেলেপিলেদের সাথে মিলে রোজার ঈদের আগে ঈদ কার্ড, খেলনা আর লটারির দোকান সাজিয়ে বসত আবির। তারপর যখন একটু বড় হলো, সিন্দাবাদ আর ম্যাকগাইভারের ভুত মাথায় চেপে বসল। সিন্দাবাদের মতো নাবিক হয়ে সে আরব সাগর পাড়ি দিতে চায় আবার ম্যাকগাইভারের মতো মাথা খাটিয়ে সমাধান করতে চায় নিত্যদিনকার সমস্যা। আরেকটু যখন বড় হলো তখন মাথায় চেপে বসল গোয়েন্দাগিরির ভূত, তিন গোয়েন্দা…মাসুদ রানা…ফেলুদা, এসব পড়েই দিন কাটছিল তার। কখনো কখনো হেনরি রাইডার হ্যাগার্ড কিংবা উইলবার স্মিথের বই পড়তে পড়তে আবির স্বপ্ন দেখত আফ্রিকার জলে জঙ্গলে অভিযাত্রিক হয়ে ঘুরে বেড়ানোর। আবার কখনোবা জীবনানন্দ-সুকান্তের কবিতায় ডুব দিয়ে হতে চাইতো নিতান্তই প্রকৃতি আর মানুষপ্রেমী একজন লেখক কিংবা কবি। আবার কলেজে উঠে ন্যাশনাল ক্যাডেট কোরে নাম লিখিয়ে স্বপ্ন দেখতে থাকে ডিফেন্স অফিসার হওয়ার। পাশাপাশি চলছিল ক্রিকেট একাডেমীতে ক্রিকেট অনুশীলন আর অবসরে ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রপাতি নিয়ে গুঁতোগুঁতি।
একে একে সব স্মৃতিগুলো স্বচ্ছ জলের মতোই ভেসে উঠছিল আবিরের চোখের সামনে, সিটের পাশের জানালায় মাথা এলিয়ে দিতেই ঈষৎ ঠান্ডা অনুভব করলো আবির… “বাইরে কি বৃষ্টি পড়ছে, নাকি তুষার ! উহু, চোখ খুলতে মন চাইছে না। যাকগে, যা হয় হবে একটা” – মনে মনে ভাবছিল আবির। জানালার কাঁচের স্পর্শে ঠান্ডা হয়ে গেল আবিরের গাল, জ্যাকেটের ভেতর নিজেকে গুটিয়ে নিল সে, ঠিক যেমন কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল। স্নাতকের দিনগুলিতে বন্ধু-আড্ডা-পাড়ার ক্রিকেট সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে নেমে পড়ে একনিষ্ঠ সংকল্পে… সেই ম্যাকগাইভার এর মতো প্রযুক্তি দিয়ে সমস্যা সমাধানের নেশা।
মাঝপথে বাঁধা এসেছিলো অনেক, এক পর্যায়ে ক্লান্ত পরিশ্রান্তও হয়ে পড়েছিল বটে। উপর ওয়ালা অবশ্য সহায় ছিলেন, আর তাঁরই কৃপায় স্নাতক শেষ হতে না হতেই মিলে যায় মনমতো একখানা চাকুরি। বাড়ি থেকে বেশ দূরে আঁকাবাঁকা আর উঁচুনিচু পথ বেয়ে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে সেই গবেষণাগার, রিসার্স ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে সেই প্রথম চাকুরি আর খেয়ালখুশি মতো গবেষণা কার্যক্রম। ঠিক যেমনটা আবির মন থেকে চেয়েছিল, তেমন মনের মতো কর্মস্থল। কিন্তু সেই কর্মস্থলে বছর ঘুরতে না ঘুরতেই কেমন একঘেয়েমি চলে আসে আবিরের। অধিকাংশ সহকর্মী একে একে বিদায় নিতে নিতে মাত্র তিনজন দিয়ে গবেষণা কার্যক্রম খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছিল। হঠাৎ চোখের সামনে ভেসে উঠে সেই কর্মস্থলের বসের চেহারা…
-কি, আবির সাহেব? আপনাকে যে একটা ডিভাইস দিয়েছিলাম সেটা কি টেস্ট করছেন?
-জ্বি স্যার। -ঘুমের ঘোরে বিড়বিড় করে বলছিল আবির।
-তারপর সেটা সেন্ট্রাল অফিসে ইন্সটল করছেন?
-জ্বি স্যার।
-ইন্সটল করার পর একবারও কি গিয়ে দেখে আসছেন, কি অবস্থা ওটার?
-না স্যার।
-এইতো, এই হচ্ছে যে আপনাদের সমস্যা। একটা কাজও ঠিকমতো করতে পারেন না, তার উপর যা নিজেরা বানান সব হচ্ছে খেলনা প্রজেক্ট। চলতে চলতে হুট করে বিগড়ে যায়।
“ধুচ্ছাই, নামকরা ম্যানুফ্যাকচারিং আর কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর থেকে দু-চারখানা জব অফার কোন দুঃখে যে হাতছাড়া করেছিলাম”- মনে মনে নিজেকে গালমন্দ করছিল আবির। স্যারের বকুনি খেলে আর কাজ করতে করতে হাঁপিয়ে উঠলেই আবিরের এসব চিন্তা হয়, কিন্তু বাবা-মায়ের কাছেই থেকে এই ছোটখাটো চাকরি তার কাজে ন’টা-পাঁচটার ভাল মাইনের কর্পোরেটের চেয়ে মহামূল্যবান। যেতে যদি হয় এর চেয়ে ঢের ভালো গবেষক হয়ে দূরে বহুদূরে কোথাও চলে যাওয়া, নিত্যদিনকার ঘরোয়া নানা সমস্যা আর অর্থসংকট দিন দিন আবিরকে আরো গুটিয়ে দিতে থাকে। গবেষণা, উচ্চশিক্ষা, পরিবার, ম্যাকগাইভারি কাজকর্ম আর অফিস, অথৈ সাগরে একখানা কাঠের টুকরার উপর ভেসে আছে যেন সে নির্জন একাকীত্বে।
হঠাৎ আবিরের ঘুম ভেঙ্গে যায় মেট্রোর স্পীকারে ভেসে আসে তীব্র হুইসেলে আর মোটা গলার এক পুরুষকণ্ঠ…
-Everyone please keep seated and grab stable things around you. There is a fault in our engine and this vibration is the effect. We are solving the issues as early as possible.
কিন্তু ঝাঁকুনির পরিমাণটা ক্রমশই বাড়ছে, এভাবে চুপটি করে বসে থাকলে কি না কি অঘটন ঘটে যায় আল্লাহই জানে। তাড়াতাড়ি সিট থেকে উঠে ইঞ্জিন রুমের দিকে এগুতে থাকল আবির। দায়িত্বরত অফিসার আর চালককে অনেক পরিশ্রম করে বোঝাতে সমর্থ হলো যে, ইঞ্জিনের ফল্ট ডিটেকশান নিয়ে সে কাজ করছে। সম্মতি পেয়েই হাতের স্মার্টওয়াচ এর সাথে একটা কেবল কানেক্ট করলো। বেশ খানিক্ষণ কয়েকটা এপস নিয়ে এনালাইসিস করার পর পাঁচ মিনিটের মাথায় অবশেষে ইঞ্জিনের সমস্যা বের করতে সমর্থ হলো আবির। আবার ঠিকঠাক প্রোগ্রাম করে দিতেই সমস্যার সমাধান হয়ে গেল, ঝাকুনিও কমে গেল। ইঞ্জিনরুমে থাকা প্রকৌশলী, চালক আর নিরাপত্তাকর্মীদের সাথে সাথে যাত্রীরাও সমোস্বরে বিজয়ধ্বনি দিলো, পিঠ চাপড়ে দিচ্ছিল আশে পাশের কয়েকজন।
এবারো আবির নিজেকে সবার থেকে গুটিয়ে নিতে নিতে অনুভব করছিল কে যেন তাকে পিঠে হাত দিয়ে ডাকছে ……
-অই মামা, উঠেন। আর কতো ঘুমাইবেন? শেষ স্টেশন আইসা পড়ছে, নামেন নামেন।
