কামরাঙ্গীরচরের এক ঘিঞ্চিগলির শেষপ্রান্তে
দশ-বারো বর্গফুটের ঘর, প্রেসার ডাইস মেশিনের ঘটাঘট শব্দে পুরো ঘর মুখোরিত। একপাশে লম্বা
টেবিলে বসে সমানে হাত চালিয়ে যাচ্ছে জনা দশেক শিশু শ্রমিক। ট্যানারির ছিঁড়া ফাটা লেদারের
এক বস্তা এনে ধপ করে মাটিতে ফেলল নজরুল।
-জমির বাই, আজকে টেহা বেশি দেওন লাগবো। চার-পাঁচখান
ট্যানারি ঘুইরা ঘুইরা ঝুট লেদার টোকাইছি, এই এক বস্তা লেদার নিয়া ফিরতেই মেলা ধহল গেছে।
-আচ্ছা, এই দুইশত রাখ। বাকি টেহা কাইলকা লইছ।
নজরুল যেতেই জমির এক ঝটকায় বস্তা ছিড়ে ফেলল,
ঠিক তখনই আমার জন্মস্থানে আত্মপ্রকাশ। বেছে বেছে দুহাতে বেশ কিছু লেদারের সাথে আমার
এই বহিরাবরণকেও সাথে নিল জমির। এরপর চলল মিনিট বিশেকের পলিশ, পলিশে পলিশে আমার বাদামী
বর্ণের ত্বকটা খুব চকচকে হয়ে উঠেছে। ডাইস প্রেসার মেশিনের নিচ দিয়ে যখন যাচ্ছিলাম তখন
আমার মৃদু হাসি পাচ্ছিল কেননা এর আগেও বার কয়েক প্রেসার মেশিনের নিচ দিয়ে যেতে হয়েছে
আমায়। ডাইস এর শেপ অনুযায়ী চিঠির খামের মতো আকৃতি পেলাম আমি, এরপর কি হয় কেজানে।
শ্রমিকদের হাতে সেলাই পড়ল আমার গায়ে, এরপর
গায়ের উপর গরম ডাইসের কোন এক কোম্পানির ছাপ পড়ল। হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে লাগানো হলো টিপ
বোতাম। পেস্টিং সলিউশন মেরে আমার ভেতরটা আঠা আঠা করে দিয়েছে এরা। যাই হোক, দুটো দিন
এই কারখানায় থেকে ঝুট লেদার থেকে চকচকে মানিব্যাগে পরিণত হলাম। এবার সংগী সাথীদের সাথে
যাত্রার পালা।
নিউমার্কেট এর ব্যাস্ত ফুটপাত, আমি ও আমার
সংগী-সাথীদের ডালায় সাজিয়ে বসে আছে এক দোকানী। কারখানা থেকে ওই আমাদের পাইকারী দামে
কিনে এনেছে। দিনের তপ্ত গরম কি রাতের আলোর রোশনাই, এই ডালায় পড়ে থেকে থেকে পুরোই অসাড়
হয়ে গেলুম। মাঝে সাঝে পুলিশের দৌড়ানি খেয়ে ডালাসহ আমাদের ছন্নছাড়া অবস্থা হয়। আমার
সামনের ছোট পকেটে থাকা ক্যালেন্ডারে আমি দিনক্ষণ হিসেব করছি…কবে আমায় কেউ আপন করে কাছে
টেনে নেবে!
ঠিক পাঁচদিনের মাথায়, উষ্কখুস্ক চুলের এক
কলেজ পড়ুয়া যুবক দোকানীর ডালার সামনে এসে দাঁড়ালো। বেশ ক্ষানিক্ষণ ধরে সে আমার দিকে
চেয়ে আছে, সে কি আমায় পছন্দ করেছে তবে? ছেলেটির ভাবভঙ্গি আঁচ করতে পেরেই দোকানী…
-“ফ্রেশ লেদার মামা, একদাম পাঁচশ।”
-ধুর মিয়া, একদামের জিনিস কিনতে হইলে ফুটপাতে
আইতাম?
-আচ্ছা, তিনশত দিয়েন যান।
-আগে দেখি ভাল করে।
-এই লন মামা।
বেশ খানিকক্ষণ আমাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার
পর ছেলেটির চোখেমুখে কিছুটা স্বস্তি ফুটে উঠল। আমিও আমার নতুন মনিবের হাতে যাবার জন্যে
হাঁসফাঁস করছিলাম।
-একশ দিবেন?
-এইটা তো রেকসিন এর মানিব্যাগের দাম কইলেন
মামা, লেখাপড়া করে যদি এই কথা কন !
-ঠিক আছে , দেড়শ।
-দুইশর নিচে এক টেকাও কম হবেনা।
শেষমেশ এই পকেট ওই পকেট থেকে খুচরো টাকা বের
করে ছেলেটি দুইশত টাকা দিয়ে আমাকে কিনে নিল, আমিও আমার নতুন মনিব পেয়ে খুশিতে গদগদ।
কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে আমাকে কিনতে গিয়ে মনিবের পকেটে আর কোন টাকাই অবশিষ্ট রইল
না, আর তাই নতুন মানিব্যাগ খালি রেখেই সে পকেটে পুরে নিল। সেই থেকে আমার পথচলা, বাড়ি
ফিরেই মনিব তার মা-বাবার ছবি রাখল আমার সামনের একটা পকেটে। টাকার চেয়ে অনেক মূল্যবান
মনে হলো ছবিগুলো আমার কাছে। তবে আমার মূল কাজ তো টাকা রাখা, তাই টাকার সান্যিধ্য না
পেতে পেতে নিজেকে কেমন একাকি লাগতো।
একদিন মনিব টিউশনির বেতন হাতে পেলেন, গুনে
গুনে চারটে চকচকে পাঁচশ টাকার নোট রাখলেন আমার মূল পকেটে। সেই দু-হাজার টাকা দিয়েই
আমার যাত্রা শুরু। এরপর কতো কালজয়ী ইতিহাসের সাক্ষী আমি…সবই আমার এই মনিবের সাথে। একটা
পাঁচশ টাকার নোট ভাংতি করেই মনিব খুচরো টাকাগুলো রাখলেন…এভাবেই চলছিল আমাদের দেয়ানেয়া।
মনিব আমার কাছে টাকা রাখতেন আর আমি সময়মতো বের করে দিতাম। সামনের একটা ছোট পকেটে খুচরো
পয়সার স্তূপ জমতো, যা বাস ভাড়া দেয়ার সময় মনিবের কাজে লাগতো।
মনিব খুব বুঝেশুনে খরচ করতেন…রিক্সায় করে
যাবার চেয়ে হেঁটেই টিউশনে চলে যেতেন। মাসশেষে দুয়েক হাজার টাকা জমিয়ে মায়ের হাতে দিতেন
আর বাকি টাকায় নিজের লেখাপড়ার খরচ চালাতেন। মাঝেমধ্যে মনিবের মা খুচরো পয়সার প্রয়োজনে
আমাকে চেক করতেন আর একদিন এক মজার কান্ড ঘটে যায়, খুচরো পয়সা খুঁজতে গিয়ে মায়ের হাতে
পড়ে যায় একখানা চিঠি। মনিবের ক্যাম্পাসের সুন্দরী জুনিয়র ইতু মনিবকে একখানা পত্র লিখেছিল,
আর মনিব সেই যে পকেটে রেখেছে একদম ভুলে গেছে। মায়ের কাছে বকাঝকা শুনে আর চোখের সামনে
প্রিয়মানুষের চিঠির দফারফা হতে দেখে মনিব আমার উপর খুব রাগ করে বসে। আমার কি দোষ বাপু,
মা’কে কি আমি যেচে পড়ে চিঠিখানা ধরিয়ে দিয়েছি?
আজ প্রায় ছ’বছর হতে চলল মনিবের সাথে আছি।
আমার বহিরাবরণে ফাটল ধরেছে, টিপবোতাম খুলে পড়ে গেছে, দুয়েকটা চেন নষ্ট হয়ে গেছে, এখনো
মনিব আমাকে আগের মতোই আগলে রাখেন। যদিও অধিকাংশ টাকার দায়িত্ব চলে গেছে ডেবিট কার্ডের
কাছে, কার্ড থেকে মাঝেমধ্যে টাকা তুলে মনিব আমার কাছে রাখেন… আবার অধিকাংশ সময় কার্ড
থেকেই খরচ করেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে সেই কার্ডও কিন্তু আমার কাছে গচ্ছিত থাকে। ও হ্যাঁ,
একপাশে মনিবের বাবা-মায়ের ছবির পাশাপাশি অন্য পাশে আশ্রয় নিয়েছে আরেকটি নতুন ছবি। মনিবের
মা ছবিখানা মনিবকে দিয়েছেন, পাত্রীপক্ষের সাথে কথাবার্তা গড়িয়েছে বহুদূর। দিনক্ষণ ঠিক
হলেই মনিবের জীবনে নতুন সঙ্গী আসবে, আমাকে কি তখনো আগলে রাখবেন মনিব? আচ্ছা, মনিবের
স্ত্রী কেমন হবে? সে আমাকে আবার ছুড়ে ফেলে দেবে না তো? যদি সে নতুন কোন মানিব্যাগ গিফট
করে তাহলে কি মনিব আমাকে আর রাখবে? --- এসব আজগুবি ভাবনা চিন্তায় দিন কাটছিল আমার।
একদিন মনিব তার জমানো টাকায় একখানা মোটরবাইক
কিনলেন। বাইক নিয়ে এদিক সেদিক ঘুরোঘুরি… চলছিল বেশ ভালোই। কিন্তু ওই দিনটির কথা মনে
পড়লে এখনো আমার কান্না পায়। হাইওয়ে ধরে প্রচন্ড গতিতে ছুটছিল মনিবের মোটরবাইক, আমার
তো ভয়ে দম বন্ধ হইয়ে গেল বলে। কিছুতেই মনিব গতি কমাচ্ছিলেন না, কি এক নেশায় পেয়ে বসেছে
তাঁকে। হঠাৎ বিপরীত দিক থেকে আসা একটা মিনিবাসের ধাক্কায় মনিব ছিটকে পড়লেন রাস্তার
একপাশে। মনিবের সারা শরীর রক্তে ভেসে যাচ্ছিল, সেই রক্তে লাল হয়েছি আমি নিজেও। বেশ
কিছুক্ষণ পর দুয়েকজন পথচারী মনিবকে দেখতে পেয়ে মনিবের মোবাইল আর আমাকে ঘেটে পরিচয় উদ্ধার
করলেন আর মনিবকে নিয়ে হাসপাতালের পথে রওনা দিলেন। হাসপাতালে পৌঁছাতে পৌঁছাতেই মনিব
আমাদের সবাইকে ছেড়ে পরপারের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন।
মনিবের লাশ চলে যায় হাসপাতালের মর্গে আর পুলিশ
আমাকে আর মনিবের মুঠোফোনটিকে বুঝিয়ে দেয় মনিবের মায়ের কাছে। মা সেদিন আমাকে চোখে-মুখে
জড়িয়ে ধরে সে-কি কান্না। মায়ের চোখের জলে আমার গায়ে লেগে থাকা মনিবের শুকনো রক্ত মুছে
যাচ্ছিল। আমিও ভেতরে ভেতরে প্রচন্ড কষ্ট পাচ্ছিলাম। প্রায় ছ’টি বছর ধরে মনিব আমাকে
আগলে রেখেছেন, এখন আমি কার পকেটে স্থান নেব?
সেই থেকে আমার স্থান মনিবের রুমের শোকেসে, মনিবের ব্যাবহৃত কিছু জিনিস আর ছবির সাথে পড়ে ছিলাম বেশ ক’টি বছর। মনিবের মা যতদিন বেঁচে ছিলেন আমাকে আগলে রেখেছিলেন। এরপর দিন গেল, মাস গেল, বছর গেল…মনিবের স্মৃতি একে একে সবাই ভুলে যেতে বসল। সময়ের পরিক্রমায় আমার স্থান হলো শহরের ময়লা আবর্জনার স্তূপে। আমার শরীরের অধিকাংশই আবর্জনার সাথে মিশে গেছে, আর কিছুটা বাকি আছে …সপ্তাখানেক যেতেই পুরোপুরি মিশে যাব। শেষ হবে আমার আত্মকাহিনী।
