বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২০

ট্রানজিস্টর

তাড়াহুড়োয় কলমটা ফেলে এসেছে আবীর। পাশের সুন্দরী মেয়েটির কাছে কলম চেয়ে কিছুটা লজ্জিত হলো সে, কেমন বাঁকা চোখে তাকাল মেয়েটা । যদিও কলম দিল মেয়েটি, কলমে ছিল বার্বি ডলের স্টিকার লাগানো। আমতা আমতা করে আবীর বলল
-“ধন্যবাদ। আমি আবীর, বিএফ শাহীন
-“হা...হা...হা , অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল মেয়েটি। বি...এফ ???  এমন প্রাণখোলা হাসি আবীর কখনো দেখেনি । হাসি থামিয়ে মেয়েটি বলল আমি রামিসা। এক্স ক্যান্ট পাবলিক
ক্লাসে হাতে গুনা গোটা পাঁচেক মেয়েদের মধ্যে রামিসা অন্যদের চেয়ে একটু আলাদা। হাসিখুসি-প্রাণোচ্ছোল , অনেক ফ্রেন্ডলি। বাবা মায়ের ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে এসেছে। তাদের স্বপ্ন ছিল, মেয়ে একদিন ডাক্তার হবে। কি না কি, পান্তা ভাতে ঘি ।
এদিকে আবীর বাবা-মায়ের বাধ্য ছেলে। বাবা নামকরা ইঞ্জিনিয়ার, তাই তাকেও ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে – ইহাই যেন বিধির লিখন। তো বিধির লিখনকে খন্ডাতেই হোক কিংবা তাহা শিরোধার্য রাখবার জন্যেই হোক , আজ তারা দুজনই নামকরা এক বিশ্ববিদ্যালয়ে।
ক্লাসের সবচেয়ে দুষ্টু ছেলে রকি। এমন কোন কাজ বাকি নাই রকি করতে পারে না। তবে অফ প্রিয়ডে পুরো ক্লাসকে মাতিয়ে রাখার জন্যে সে একাই যথেষ্ঠ । এভাবেই হাসি আড্ডা মজায় কিভাবে কিভাবে যেন চলে যায় একটি সেমিস্টার। রামিসা ও আরো ৪-৫ জন ছেলে কেবল সব বিষয়ে পাশ করতে পারল। আর বাকিরা সবাই কোনটা না কোনটাতে গেছে ।
এভাবে নিয়মিত বোরিং ক্লাস লেকচার, এসাইনমেন্ট , ল্যাবের প্যারায় তাদের প্রায় সবারই যায় যায় অবস্থা। অনেকেই মুখ ফুটে তেমন কিছু বলে না, একবার যেহেতু শুরু করেছে এর শেষ দেখেই ছাড়বে। তবে রকি আর সবার থেকে আলাদা... সে প্রতিনিয়তই ডিন স্যারকে বলে – স্যার প্রেসার ইক্যুয়েলস টু , ফোর্স বাই এরিয়া তো স্যার। আর কত ??
দিন যায় দিন আসে , ছোট ছোট কিছু হাসি আড্ডা গল্পে মুখর হয়ে উঠে এই ব্যাচের ছাত্রছাত্রীরা। নানান কিছিমের মানুষে গড়া এই ২০তম ব্যাচ। কেউ এক বছর ড্রপ দিয়ে ভর্তি হয়েছে, কেউবা দু বছর। আবার কেউবা চাকুরি করে পড়ালেখা করছে। কেউ কেউ ৪-৫ টিউশনি কিংবা কোচিং এ ক্লাস নিতে ব্যাস্ত। সবচেয়ে মজার বিষয়, এই ব্যাচে বিবাহিত ছেলেই আছে দুই দুইটা, অধিকাংশ ব্যাচেলর ছেলে এদের কাছে দীক্ষা নিয়ে থাকে।  
রামিসা আর আবীরের মধ্যে বন্ধুত্ব দিন দিন জমতে থাকে। যথারীতি ফাইনাল ইয়ার এর প্রজেক্ট সাবমিট করার তারিখ পড়ে এই ২০তম ব্যাচের, আর কাকতালীয়ভাবে আবীর-রামিসা পড়ে একই গ্রুপে। তাদের প্রজেক্টটাও খুব দারুণ হয়। প্ল্যানিং থেকে শুরু করে সবকিছুই তারা হাতে হাতে করেছে । তো অন্য সব প্রজেক্ট থেকে তাদের টাই সেরা বিবেচিত হলো ।
একদিন তাদের শেষ সেমিস্টারটিও চলে গেল, RAG ডেও হইয়ে গেল বেশ বড়সড় আয়োজনে ...। প্রত্যেকে অশ্রুভরা নয়নে তাদের সহপাঠীদের বিদায় দিল বিষ্ববিদ্যালয় জীবনের শেষ দিনটিতে।
এরপর দিন যায় দিন আসে, যে যার মতো কর্মক্ষেত্রে যোগ দিতে লাগল একে একে
অনেকদিন পর সমাবর্তনে দেখা হলো আবীর আর রামিসার । দুজনের বন্ধুত্ব ঠিক আগের মতোই আছে , তবে কেউ কাউকে ভালবাসি কথাটি বলতে পারেনি । আবীর বলল ,
-“আচ্ছা রামিসা – একটা উত্তর দিবে ? ফাইনাল ইয়ারের প্রজেক্টের শেষে তোমাকে যে ট্রানিজিস্টর টা দিয়ে বলেছিলাম ৭ নং পিনের সাথে কমন বেস কানেকশন দিতে, দিছিলা ?”
একটু ভেবে রামিসা বলল,
-“দিছিলাম তো, বাট ট্রানিজিস্টর টা তো পুড়েই গেল” ।
অনেকটা ব্যাথা বুকে নিয়ে বিদায় নিয়ে চলে যায় আবীর। বেশ কদিন পর রামিসা সেই ট্রানজিস্টর আরেকটা বাজার থেকে এনে ঠিকঠাকভাবে সংযোগ দেয় । ডিসপ্লে তে চোখ রেখে চোখের অশ্রু ধরে রাখতে পারে না, I LOVE YOU লেখা। দ্রুত পায়ে বেরিয়ে যায় রামিসা। কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গেছে । আবীর সকল পিছুটান ছিন্ন করে স্কলারশীপ নিয়ে চলে গেছে দেশ ছেড়ে।


জীবনবোধ


এক

দুপুরের খাঁ খাঁ রোদ , মাত্রই স্কুল ছুটি হলো । স্কুল থেকে নুহাস বাড়ি ফিরছে , বাড়ি ফেরার পথে পুকুরে ওর বয়সী ছেলেপিলেদের দাপাদাপি দেখে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে ।

-আহ , কতই না মজা করছে এরা । কিন্তু মা কেন যে সব সময় কলের পানিতেই গোসল করতে বলে। আচ্ছা, ওদের যদি গিয়ে বলি , আমাকে কি ওরা একটু নাইতে দেবে ? আচ্ছা মাছও তো ধরতে পারব বোধ হয় ,

বইতে যেমনটি পড়েছি – আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে , বাঁকে ...... বৈশাখ মাসে তার হাটু জল থাকে

সকালে বিকালে কভু নাওয়া হলে পরে, ............ আঁচলে ছাকিয়া তারা ছোট মাছ ধরে  //

কিন্তু নদী তো কখনোই দেখলাম না , পুকুর আর নদীতে তাহলে তফাৎটা কি খানিক বাদেই পেছন থেকে নুহাস কে ডেকে উঠে সাব্বির ...

-নুহাস, দাঁড়িয়ে আছিস কেন ? দুপুরে কোচিং আছে তো । আজকে না আবার গ্রামার এক্সাম আছে- যাবি না ? চল।

-আরে দাঁড়া, এক্সাম তো প্রায়ই থাকে, কতই বা মার্কস পাই । আমার কখনোই হায়েস্ট মার্ক পাওয়া হয়ে উঠবে না ।

আচ্ছা সাব্বির , তুই কি কখনো নদী দেখেছিস ?

-হ্যাঁ, আমরা যখন ঈদে বাড়ি যাই লঞ্চেই যাই। তখন দেখি।

-অনেক সুন্দর, নারে ? বাঁকে বাঁকে বয়ে চলে । আমাদের বাড়িই তো এইখানে , আব্বুও কখনো তেমন কোথাও নিয়ে যায়নি।

- আচ্ছা চল এখন । কাল তো ফ্রাইডে , কম্পিউটারে “কল অব ডিউটি” খেলব । আব্বু কালই গেমস এর সিডি-টা এনে দিল ।

সূর্যের কিরণ সামান্য হেলে পড়ে প্রস্ফুটিত করে আছে চারদিক । রাস্তা ধরে বাড়ির পানে হাটতে হাটতে নুহাসের মনে উকি দিয়ে বেড়ায় খালি গায়ে পুকুরে লাফ দেয়ার স্বপ্ন – কি যেন চিন্তে করে জামার দুটো বোতামও খুলেছিল । কিন্তু স্বপ্ন যে স্বপ্নই থেকে গেল। 

সন্ধ্যেয় নুহাসের হোম টিউটর রায়হান স্যার এলো । রায়হান স্যারকে নুহাসের খুব ভাল লাগে । তাঁর সহজ-সরল মন্ত্রমুগ্ধ কথা আর কোমল-কঠোর শাসন তাকে সত্যিই বিষ্মিত করে।

-আচ্ছা স্যার ? মানুষ মরে গেলে কি পঁচে যায় ?

-হুম , হঠাৎ এই প্রশ্ন ?

- না মানে আমরা মাটিকে এতো অবহেলা করি তো – তাই বুঝি মাটি আমাদের পঁচিয়ে দেয় ।

- না নুহাস । আসলে মাটিতে কিছু ব্যাকটেরিয়া থাকে , যা প্রাণীদেহ পঁচাতে সাহায্য করে।

- না স্যার । গায়ে সামান্য ধুলা লাগলে আম্মু যা বকা দেয়, মাটি তখন খুব কষ্ট পায় । আর তাই ব্যাকটেরিয়া ডেকে আমাদের পঁচিয়ে দেয় ।

- সত্যি বলতে কি নুহাস, আমরা সবাই মাটির মানুষ – আমাদের একদিন মাটিতেই মিশে যেতে হবে।

- তাহলে বিকালে কোচিং থেকে আসতে দেখলাম, ছেলেরা ধুলোবালি গায়ে ফুটবল খেলছে। এরাও তো মাটিতে মিশে আছে। এদের কি মাটি ব্যাকটেরিয়া দিয়ে আবার মিশিয়ে দেবে ?

............প্রশ্নটির উত্তর রায়হান দিতে পারে না। কেবল নিশ্চুপ হয়ে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে নুহাসের দিকে।

 

দুই

ইদানিং পড়ালেখায় আর মন বসে না রাইসার। মনের মধ্যে কি যেন এক পরিবর্তন সে অনুভব করতে পারে, কিন্তু কাউকে খুলে বলতে পারে না। বাড়িতে যে সে বড্ড একা। ছোটবেলায় মায়ের মৃত্যুর পর সৎ মা যে তাকে বলতে গেলে একেবারেই কাছে টেনে নেয়নি । আর তাই সন্ধ্যে হলেই পছন্দের টিভি সিরিয়ালগুলোই তার নিত্য দিনের সঙ্গী ।

হঠাৎ রাইসার ফোন বেজে উঠল , তার সহপাঠী কনিকা ।

-হ্যালো , রাইসা ।

-হুম, ভালো আছিস ?

-হুম , কি করিস রে ?

- এইতো, সিরিয়াল দেখি। “বোঝেনা সে বোঝেনা” ।

- দোস্ত , আর বলিস না । আজকে অরণ্য কে যা হ্যান্ডসাম লাগছে না মাইরি ।

- তোর ভাষার কি ছিরি রে এসব ?

-আর বলিস না , দিন দিন ওদের মতো হয়ে যাচ্ছি ।

- আচ্ছা শোন , কাল তোর সাথে কথা আছে ।

হঠাৎ মায়ের চিৎকার ......... হারাদিন কি গুজুর গুজুর , ফুসুর ? তোর বাপে কি এড়ে চর পোয়া লাই গেইয়ে নে তরাতড়ি আই নি চুলেত ভাত বোয়া । ভাত বোয়াই নি সবজি গিন কুডি ল । আই নাটক গো চাই লই ।

-জি আম্মু।

অসহায় দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ টিভির দিকে তাকিয়ে থেকে একখানা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে উঠে যায় রাইসা।

পরদিন সকালে............

-কনিকা, বেশ কদিন ধরে আমার না কেমন অস্বস্তি লাগছে। ঠিকমত খাওয়া দাওয়া হয় না, ঘুম হয়। নিজেকে কেমন যেন অচেনা লাগে ।

-আরে বুঝিস না। এই বয়স এ ও রকম হয়। কেন তোর আম্মু তোরে কিছু বলে নাই ?

-না রে, সেইদিন পেটব্যাথা করছিল // বলল – ফকির বাবার কাছ থেকে পানি পড়া আনি খা।

-আচ্ছা, তুই তো আমাদের শারিরীক শিক্ষা আপার কাছ থেকে পরামর্শ নিতে পারি। জানিস না ? কিশোরী স্বাস্থ্য উন্নয়নের লক্ষ্যে স্কুলভিত্তিক কার্যক্রম এ আপা সংযুক্ত আছে ।

-ও......... তাই নাকি ? আচ্ছা। ভালই হলো তাহলে বল ।

হঠাৎ শিক্ষক এসে পড়ায় ক্লাসে শুনশান নীরবতা নেমে আসে। রফিক স্যার অন্যান্য দিনের মতোই নাম ডাকা শেষে মার্কার নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। হঠাৎ কি মনে করে বলে উঠলেন –

-আচ্ছা আমরা তো সব সময়ই বই এর পড়া পড়ি, আজ একটু জীবনবোধ নিয়ে আলোচনা করি ।

গতানুগতিক বোর্ডের লেখা তোলা থেকে ছুটি পেয়ে শিক্ষার্থীরা যেন হাঁফ ছেড়ে বাচল। ছাত্রছাত্রীদের নিজেদের মধ্যে কথা বলতে দেখে স্যার বললেন,

-আচ্ছা, তোমরা কি লেখাপড়ার প্রকৃত উদ্দেশ্য জান ? কেনই বা আমরা বিদ্যালয়ে আসি ? পড়াশুনা করি কি শুধু একটু ভালভাবে বেঁচে থাকার জন্যে ? নাকি প্রকৃত মানুষ হবার  জন্যে ?

শিক্ষার্থীরা নিশ্চুপ , তাদের মধ্যে ভাবোদয় হয়েছে । শিক্ষক প্রত্যেকের কাছ থেকে তাদের মতামতটুকু জানতে চাইলেন।

এরপর শেষে পরবর্তী ক্লাসের জন্য একখানা ছোট কাজ দিলেন।

-ধর তোমাদের একটি খালি কাচের জার দেয়া হলো । আর দেয়া হলো কিছু নুড়ি,পাথর আর বালি । কিভাবে জারটি পরিপূর্ণ করে ভর্তি করতে পারবে যাতে কোন উপাদান অবশিষ্ট না থাকে ? আমাদের জীবনটা যদি এই কাচের জার হয় তবে এই নুড়ি, বালি আর পাথরগুলো জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই কাজটা ভালোভাবে করতে পারলে জীবনবোধ নিয়ে তোমাদের ধারণা আরও স্পষ্ট হবে।

 

সেদিনের মতো ক্লাস শেষ। শিক্ষার্থীরা প্রত্যেকেই যে যার মত ভাবনায় লেগে পড়ল, আর রাইসা নুড়ি , বালিআর পাথর জোগাড় করতে বাইরে গেল । রাস্তার  পাশের ঐ নির্মাণাধীন ভবনের পাশে বেশ কিছু  নুড়ি,বালি আর পাথরের স্তূপ ছিল। রাইসা আনমনে নুড়ি কুড়াচ্ছিল । আচমকা.........

-দোস্ত,পাখি টা না সেইরম। দেখ দেখ বাসা বানাইবো বইলা নুড়ি কুড়াচ্ছে। ল চল ।

- তেরি ফটো কো সিনে সে ইয়ার , চুপ কালে ছাইয়া......

-ফেবিকল সে.........

-ঐ মাইয়া, নুড়ি লাগব নি নুড়ি ? আহো, আমার কাছে নুড়ি আছে, চুনি আছে , মুক্তা আছে। আরে যাও কই ?

-দোস্ত, ডরাইছে । ল , পিছু লই ।

-আরে যাও কই ?

রাইসা প্রাণপণে ছুটে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেল। যেতে যেতে গায়ে পড়ল বখাটেদের ছুড়ে দেয়া বেশ কিছু নুড়ি পাথর।

বাসায় এসে রাইসা অঝোরে কাঁদতে লাগল। তাঁর মনে হাজারো প্রশ্নের ভীড়- এই কি তবে কাঁচের জারে বন্দী জীবন ? এই কি আমাদের সমাজ ?

 

তিন

পাঁচটি বছর কেটে গেছে। নুহাস-সাব্বির-রাইসা-কনিকা প্রত্যেকেই এখন সদ্য উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডী পেরোনো চার  তরুণ-তরুণী। একটি বিবাহের অনুষ্টানে তাদের দেখা.........কনিকা প্রথমেই শুরু করে,

-সাব্বির, কি ভাবছিস রে ? আমাদের রেজাল্ট তো তেমন ভাল হলো না ।

-আব্বু বলল, বিদেশ পাঠিয়ে দেবে। সে লক্ষ্যেই প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। কিন্তু হঠাৎ আব্বু হার্ট এটাক করে বসল;

-কি বলিস ? তাহলে তো আঙ্কেল এর পাশে থাকাটাই বেস্ট হবে।

এরই মধ্যেই ভাবুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা নুহাসের দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দেয় কনিকা।

-কিরে, তোর কি চিন্তা ভাবনা ? আর কত বাধ্য ছেলে হয়ে থাকবি ? এখন অন্তত কিছু একটা তো ডিসিশন নিজে নে-

-কেমনে নেই ? আব্বা বলে রাখছে ডিফেন্স এ জব পাইতেই হবে,পরিবারের হাল ধরা লাগবে।

-তো এটেন্ড কর।

-কিন্তু আমি তো স্বপ্ন দেখতাম শৃঙ্খলহীন মুক্ত-স্বাধীন জীবনের। আর এ লক্ষ্যেই মনের কোণে লালন করে এসেছি ভার্সিটি তে পড়ার স্বপ্ন। মনে আছে তোদের, স্যারের সেই নুড়ি,বালি,পাথর আর খালি জার ? এখনো পরিপূর্ণ করতে পারলাম না রে ।

-আচ্ছা কনিকা, তোর কি ভাবনা-চিন্তা । বন্ধু নুহাস কথা বলতে বলতে ভাবুক হয়ে পড়ায় পরিস্থিতির সামাল দিতে প্রশ্ন করে বসে সাব্বির।

-আমার ইচ্ছে ছিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার, কিন্তু বাবার ইচ্ছে মেয়েকে ডাক্তার বানাবে।

রাইসা প্রথম থেকেই নীরব । তাঁর জীবন নামক কাঁচের জারটার ঢাকনা যে এঁটে গেছে ........

 

                  ----------------------------------------- ০ ---------------------------------------


দু পয়সার লেখক


#পাকিং ... কি বিদঘুটে শব্দ রে বাবা,কে যে এই মেসেঞ্জারের সাউন্ড টা এড করছিল... 
মোবাইল ডাটা অন করেই বিরক্তভাবে স্ক্রীনের দিকে তাকায় অর্নব। মেয়ে আইডি থেকে আসা মেসেজ দেখেই বিরক্তি উবে যায়।
.
-hlw
-hi
-আপনার লেখাগুলো খুব ভাল লাগে

-ধন্যবাদ।
-আচ্ছা, আমাকে কি একটা লেখা লিখে দিতে পারবেন ?
-কি নিয়ে?
-আমাকে নিয়ে।
-লাঞ্চ করেন নাই মনে হয়?
-আজব তো।
-আপনাকে আমি চিনি না জানি? আপনাকে নিয়ে কি লিখব?
.
কয়েকটা রাগী ইমো দিয়ে মোবাইল ডাটা অফ করে দিল অর্নব। এমনিতেই পরীক্ষা খারাপ হবার কারণে সকাল থেকেই মাথাটা গরম হয়ে আছে। তার উপর যত সব উটকো ঝামেলা।
চায়ের কাপে শেষ চুমুকটা দিয়ে সাইকেল নিয়ে বেড়িয়ে পড়ে অর্নব ।
.
এদিকে অর্পিতারও খুব মন খারাপ। লেখা পড়ে মানুষটিকে যতটা হেল্পফুল মনে করেছিল ঠিক ততটা নয় অর্নব, দু পয়সার লেখকগুলা এমনই হয়- মনে মনে নিজেকে সান্ত্বনা দিল অর্পিতা।
.

#এক_সপ্তাহ_পরঃ
পুরোনো ইনবক্স চেক করতে গিয়ে অর্পিতার মেসেজটা চোখে পড়ল অর্নবের। রাগের মাথায় কি না কি রিপ্লাই দিয়েছিল, মেয়েটা আর তো কিছুই বলল না। সরি বলে নেয়াটাই ভাল হবে।
যেই ভাবা সেই কাজ,সরি লিখে কিছু ইমো দিয়ে সেন্ড করল অর্পন।
মিনিট পেরিয়ে যায়, ঘন্টা পেরিয়ে যায়; অর্পিতাকে অনলাইনে সো করছে।কিন্তু কোন রিপ্লাই দিচ্ছে না। এই একটা সময় অর্পনের খুব খারাপ লাগে, যখন কেউ মেসেজ seen করেও কোন রিপ্লাই দেয় না; তার উপর আবার অনলাইনে Activity ও দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে কানের গোড়ায় কেউ থাপ্পর দিয়ে গাল লাল করে দিয়েছে।
এরই ফাঁকে অর্পিতার টাইমলাইন হাতড়ে বেড়াতে লাগল অর্পন। অন্য সব মেয়েদের মত করে প্রোফাইল সাজায়নি, একটু ভিন্ন। আজকাল তো অধিকাংশ মেয়েই ফেসবুকের ম্যানেজার, কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার এট মিরপুর বাংলা কলেজ..................ব্লা ব্লা ।
.
জগতের অন্যান্য সব কিছুর মতই আমিও আপেক্ষিক, পরম নই” – Bio এর info টা মুগ্ধ করল অর্নব কে। নাহ, যেমনটা ভেবেছিলাম তেমন নয় মেয়েটি। দেখতেও বেশ কিউট।
.
অর্পিতা তার নিজ টাইমলাইনে অর্নবের Activity দেখে কিছুটা নরম হলো। রিপ্লাই দিল-
.
-im sorry.too
-কেন?
-আসলে আপনিই ঠিক। আপনি তো আমাকে চিনেন না, হঠাৎ করে তখন আমার ওভাবে বলাটা উচিত হয়নি।
-আপনি কিন্তু আমাকে লজ্জা দিচ্ছেন।
-লজ্জাও পান তাহলে?
-একটু আকটু তো পেতে হয়।সেদিন আমার মাথাতা ঠিক ছিলনা।
-হইছে, বাদ দিন। আপনি তো আবার চিনেন না আমাকে।
-অদ্ভুত মেয়ে তো আপনি।
-হুম, চিনলেই বুঝবেন। কতটা অদ্ভুত।
.
#কয়েক_মাস_পর
সকালটা বেশ চনমনে লাগছে অর্পিতার, আজই তার সেকেন্ড প্রফটা শেষ হবে। পড়তে পড়তে পুরো পাগল হবার জোগাড়। মেডিকেলের প্রফ যে কি, তা একমাত্র একজন মেডিকেলের ছাত্রই জানে। যেন এক একটা পুলসিরাত।
বিকেল বেলা কলেজ থেকে বেরিয়ে ভাবল, কোথাও ঘুরে এলে মন্দ হয় না। হঠাৎ অর্নবের ফোনঃ
-হ্যালো, অর্পিতা। এক্সাম কেমন হলো তোমার ?
-হুম ভাল। এই শোন, কোথায় আছ তুমি ?
-এইতো, আড্ডা দিচ্ছি বন্ধুদের সাথে।
-আমার সাথে একটু ঘুরতে যাবা ? অনেকদিন পর একটু প্রফুল্ল লাগছে।
-কই যাবা ?
-যেখানে নিয়ে যাবা। প্রকৃতিকে যেখানে খুব কাছ থেকে উপভোগ করা যায়।
-আচ্ছা, আসছি আমি। তুমি কলেজ গেটের সামনেই থাকো।
.
গত কয়েক মাসে অর্নব আর অর্পিতার সম্পর্কটা বেশ সহজ হয়ে এসেছে। এখন তারা বেশ ভালো বন্ধু। একজনের সুখেদুঃখে আরেকজন পাশে দাঁড়ায়। অথচ কে বলবে, কদিন আগেই এদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি ছিল।
একসাথে ঘুরতে যাওয়া, সিনেমা দেখা, সোশাল ওয়ার্ক, থিয়েটার , ডিবেট ......... এককথায় অর্পন সুঁই হলে অর্পিতা সুতা। দুয়ে মিলেই সেলাইয়ে যাচ্ছে শীতের কাথা।
.
.
বিগত এক বছরে অর্পিতাকে বেশ ভালোভাবেই চিনেছে অর্পন। মনের অজান্তেই সে তাকে নিয়ে চমৎকার একটা লিখা লিখে ফেলল। বেশ খানিকটা বাকি আছে, কিন্তু লিখাটা দিলে অর্পিতার অনুভূতি কি হতে পারে, এটা ভাবতে ভাবতেই আর দেয়া হয়ে উঠে না।
অর্পনকে নিয়ে অর্পিতার দৃষ্টিভঙ্গি আগে থেকেই ভালো ছিল, দিন দিন তা কমেনি............
বেড়েছে বরঙচ।
তার মত লেখা দু পয়সার হলেও মনটা কিন্তু কোটি টাকার। দু পয়সা কিংবা দু কোটি, সবই অর্পিতার কাছে আপেক্ষিক। এসব অর্থমূল্যে বিচার হয় না।
.
হাইওয়ে ধরে বাস শোঁ শোঁ করে চলছে। অর্পন দ্রুত আঙ্গুলে চ্যাট করে যাচ্ছে।
-কোথায় যাচ্ছ, হঠাৎ ?
-এইতো ঢাকা যাচ্ছি। একটা প্রজেক্টের কাজে ।
-, বলে গেলেই পারতে।
-একটু তাড়াহুড়োয় ছিলাম। একটা NGO এর জন্য ডকুমেন্টরি করতে হবে।
-আচ্ছা, তাই বলো।
.
.
. (5 minutes ago)
-hey…hey
-কি হলো? রিপ্লাই দাও না কেন?
.
.
-(30 minutes ago)
-ফোন অফ কেন তোমার?
-কি হলো?
-can you hear me?
-please pick up the phone.

.
.
#পরদিন
হাসপাতালের বেডে শুয়ে কাতরে যাচ্ছে অর্পন। বাস এক্সিডেন্ট এ গুরুতর আহত হয়েছে সে
বাসের আরো ১২ জন যাত্রী স্পট ডেড। অর্পনের হাত দুটোর অবস্থা খুবই গুরুতর- খুব রক্তক্ষরণ হচ্ছে। ডাক্তার এসে বললঃ হাত দুটো কেটে বাদ দিতে হবে,নয়ত বাঁচানো যাবে না। অর্পন কথা বলতে গিয়েও পারল না- বাকশক্তি হারিয়েছে। যেন ঘোরের মধ্যে আছে, কখন কি হচ্ছে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না।
অর্পিতার জন্যে লিখে রাখা লেখাটি দেয়া হলো না। “ভালবাসি”- কথাটি লিখা হয়ে উঠেনি সে লেখায়। নিজেকে
খুব রিক্ত-শুন্য মনে হচ্ছে এ দু পয়সার লেখকের

.
.

#নীল_বর্তনী
২৭-১১-১৬


অরুণোদয়

তখন মধ্যরাত, কাজ শেষ করে ব্যাগপত্র নিয়ে ল্যাব থেকে বেরুচ্ছিলেন প্রফেসর ডক্টর অরুণ। বিগত নয়টা মাস প্রচুর খাটুনি গেছে তার উপর দিয়ে। শিক্ষার্থী...